গাছের অভাবে শহরে তাপমাত্রা বাড়ছে অস্বাভাবিকভাবে

গাছের অভাবে শহরে তাপমাত্রা বাড়ছে অস্বাভাবিকভাবে

সবুজহীন নগরের বুকে গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহে জনজীবনের দুর্ভোগ যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে। সুদূর অতীতে যে ইট-পাথরের শহরে শতবর্ষী কোনো বটবৃক্ষ এক চিলতে ছায়া বিলিয়ে দিত, আজ সেখানে শুধুই ধূসরতার আগ্রাসন। আমরা উন্নয়নের নামে সবুজকে বিসর্জন দিয়েছি, আর তারই চড়া মাশুল গুনছি শরীর পোড়ানো এই অস্বাভাবিক দাবদাহে। প্রায় বৃক্ষহীন এই শহর যেন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে সাহারা মরুভূমির মতো এক উত্তপ্ত জনপদে।

গাছ যাকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস। অথচ সভ্যতার আমূল পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে আমরা নির্বিচারে সেই গাছ কেটেই নির্মাণ করছি সুউচ্চ ইমারত। ফলশ্রুতিতে কংক্রিটের এই নগরীতে বাতাস ক্রমাগত হয়ে উঠছে দহনজ্বালা। প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মে গাছ তার পাতা থেকে পানি বাষ্পীভূত করে চারপাশের পরিবেশ ঠান্ডা রাখে এবং প্রকৃতিতে ছড়িয়ে দেয় স্নিগ্ধতা। শুধু তাই নয়, গাছপালা বাতাসের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে উষ্ণ বাতাসকে উপরে তুলে শীতল বাতাসকে নিচে নামতে সহায়তা করে। গাছের শিকড় মাটিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে রাখে, যা অতিবৃষ্টি কিংবা বন্যায় মাটি ক্ষয় রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। তাই একটি গাছ কেবল অক্সিজেনের উৎস নয়; উত্তপ্ত নগরীতে তা এক টুকরো প্রশান্তির ছায়া। দুঃখজনক হলেও সত্য, উন্নয়নের অসম প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গিয়ে আমাদের প্রিয় শহরগুলো আজ রূপ নিয়েছে ‘হিট আইল্যান্ড’-এ। বহুতল ভবনের কাচ আর পিচঢালা কালো রাস্তা সারাদিন সূর্যের তাপ শোষণ করে, পরে সেই উত্তাপই ছড়িয়ে দেয় চারপাশে। ফলে শহরের বাতাস ক্রমেই হয়ে উঠছে ভারী ও অসহনীয়। শীতল বাতাস যেন আজ নাগরিক জীবনে বিলাসিতা। পরিবর্তে মরুভূমির লু-হাওয়ার মতো উত্তপ্ত বাতাস ছড়িয়ে পড়ছে কংক্রিটের দালানগুলোর ফাঁকে ফাঁকে।

সম্প্রতি সবুজে ঘেরা অনেক পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানে গাছ কেটে নির্মাণ করা হচ্ছে কংক্রিটের স্থাপনা। আধুনিকতার স্রোতে গা ভাসাতে গিয়ে অজান্তেই আমরা নিজেদের ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করে তুলছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার বাতাসে ক্রমাগত জমা হচ্ছে কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রিক অক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড ও ওজোনের মতো ক্ষতিকর গ্যাস। এসব গ্যাস ১০ থেকে ৪০০ বছর পর্যন্ত বাতাসে থেকে যেতে পারে, যা শহরের তাপমাত্রাকে আরও অসহনীয় করে তুলছে। বিশ্বব্যাপী প্রায় নয় হাজার শহরের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বৃক্ষরাজি না থাকলে শহরগুলোর তাপমাত্রা গড়ে অতিরিক্ত ০.৫ থেকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেত। গবেষকদের মতে, পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগালে অতিরিক্ত তাপমাত্রা প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব।

আজকের শহুরে বাতাসে নেই বকুলের সুবাস, নেই পাতার মর্মর ধ্বনি। গাছ কাটার নির্মম পরিণতিতে বাতাস আজ ঢেকে গেছে কার্বন আর সিসার বিষাক্ত চাদরে। উন্নয়নের নেশায় আমরা শুধু গাছই কাটছি না, ধ্বংস করছি পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়ও। একসময় ভোরবেলায় পাখির কলতানে দূর হয়ে যেত নাগরিক ক্লান্তি, অথচ আজ সেই পাখিরা নীড়হীন ও বাস্তুহারা। উন্নয়নের কুঠার যখন একটি বৃক্ষের বুকে আঘাত হানে, তখন শুধু একটি গাছের মৃত্যু হয় না; ধীরে ধীরে মারা যায় পুরো শহরের আত্মা। শহরের এই ক্রমবর্ধমান উত্তাপ কমিয়ে সবুজের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। প্রথমত, যেহেতু শহরের অধিকাংশ এলাকা বহুতল ভবনে আচ্ছাদিত, তাই প্রতিটি ভবনের ছাদকে রূপ দিতে হবে সবুজ উদ্যানে। নীতিমালার মাধ্যমে ছাদবাগান বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, শহরের অলিগলি, লেকপাড় কিংবা পরিত্যক্ত ছোট ছোট জমিতে জাপানি ‘মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে’ পকেট পার্ক গড়ে তোলা সম্ভব। এই পদ্ধতিতে অল্প জায়গায় দ্রুত গাছ বেড়ে ওঠে এবং পরিবেশে ফিরিয়ে আনে প্রাণের সজীবতা। তবে শুধু গাছ লাগালেই হবে না; প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু গাছ উল্টো গরমের অনুভূতি বাড়িয়ে দিতে পারে, আবার কিছু গাছ তাপমাত্রা কমাতে পারে প্রায় ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। তাই কোন এলাকায় কোন ধরনের গাছ লাগানো হবে, সেটিও বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

অন্যদিকে, বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন আরও কঠোর ও কার্যকর করতে হবে। রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের স্বার্থে যদি কোনো গাছ কাটতেই হয়, তবে তার পরিবর্তে অন্তত তিনটি নতুন গাছ লাগানো বাধ্যতামূলক করা উচিত। পাশাপাশি একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে এই নগরীকে রক্ষা করতে। মিছিল, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাছ লাগানোর গুরুত্ব এবং গাছ কাটার ভয়াবহতা তুলে ধরতে হবে। যে শহর আজ তপ্ত রৌদ্রে খাঁ খাঁ করছে, মানুষের ভালোবাসা আর সচেতনতায় সেই শহরই আবার হয়ে উঠতে পারে সবুজে মোড়া শান্ত এক নগরী। আসুন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উপহার দিই নির্মল বাতাসে ভরা এক রঙিন শৈশব। ধুলোমাখা এই শহরে ফিরিয়ে আনি হারিয়ে যাওয়া সবুজের সমারোহ।

লেখক :

সাদিয়া আক্তার 

শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/173738