পদ্মা ব্যারেজ: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা
নদীমাতৃক বাংলাদেশের ইতিহাসে পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। এটি অর্থনীতি, কৃষি, পরিবেশ, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। হাজার বছরের সভ্যতা এ দেশের নদীগুলোকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। অথচ স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষকে প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে পানির জন্য সংগ্রাম করতে হয়। নদী শুকিয়ে যায়, সেচ ব্যাহত হয়, লবণাক্ততা বাড়ে, কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সুন্দরবনের মতো বিশ্ব ঐতিহ্যও ঝুঁকির মুখে পড়ে। এমন বাস্তবতায় পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প- বাংলাদেশের পানি-নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক মুক্তির একটি জাতীয় অঙ্গীকার।
২০২৬ সালের ১৩ মে, একনেক সভায় অনুমোদিত ৩৪ হাজার ৮৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকার এই প্রকল্প দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় পদ্মা নদীর ওপর নির্মিতব্য ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারেজটি ২০২৬ থেকে ২০৩৩ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে থাকবে ১১৩টি গেট এবং দুটি ব্যারেজ সেকশন। প্রকল্পটির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি মানুষ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সংকট নতুন নয়। ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকে পদ্মা নদীর শুষ্ক মৌসুমের পানিপ্রবাহ ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। এর ফলে পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গড়াই, মধুমতী, কুমার, ভৈরব ও চিত্রাসহ ৩০টিরও বেশি নদী নাব্যতা হারিয়ে মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছায়। প্রায় ১৫ লাখ হেক্টর কৃষিজমি সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। নদীর পানি প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে লবণাক্ততা ক্রমশ ভেতরের দিকে অগ্রসর হয় এবং খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলের কৃষি ও জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলেও বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে ২০১১ সালে আলোচিত তিস্তা চুক্তি এখনও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। ফলে আন্তঃসীমান্ত নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের জন্য নিজস্ব পানি সংরক্ষণ সক্ষমতা তৈরি করা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পদ্মা ব্যারেজ সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা কৃষি খাতে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন মূলত পানির প্রাপ্যতার ওপর নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণ করা গেলে কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, পাবনা, রাজশাহী ও বরিশাল অঞ্চলের প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এর ফলে ধান, গম, ডাল, তেলবীজ ও অন্যান্য ফসলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। কৃষকরা বছরে একাধিক ফসল ফলানোর সুযোগ পাবেন। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও নতুন গতি সঞ্চার হবে।
বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থায় নদীপথ একসময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় বহু নৌপথ আজ কার্যত অচল। পদ্মা ব্যারেজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পানি ধরে রাখা গেলে গড়াই-মধুমতীসহ অনেক নদীর নাব্যতা ফিরে আসতে পারে। এতে নৌপরিবহন পুনরুজ্জীবিত হবে, পরিবহন ব্যয় কমবে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে। পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকাশেও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। পরিবেশগত দিক থেকেও প্রকল্পটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মিঠাপানির প্রবাহ বৃদ্ধি পেলে লবণাক্ততার বিস্তার কমবে। কৃষি উৎপাদন বাড়বে, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা উন্নত হবে এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের জন্যও এটি আশার বার্তা বহন করে। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য অনেকাংশে মিঠাপানির প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। পর্যাপ্ত মিঠাপানি নিশ্চিত করা গেলে বনটির জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সহজ হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়বে। তবে পদ্মা ব্যারেজকে ঘিরে শুধু সম্ভাবনার কথাই বললে পূর্ণ চিত্র উঠে আসবে না। এ প্রকল্পের সামনে বেশ কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পদ্মা নদী প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পলি বহন করে। যথাযথ পলি ব্যবস্থাপনা না থাকলে ব্যারেজের উজানে পলি জমে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যেতে পারে, যা বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি করবে। একই সঙ্গে নিয়মিত ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করাও একটি ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। পদ্মা ব্যারেজের সফল বাস্তবায়ন বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। ফারাক্কার দীর্ঘ ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে পানি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষি ও অর্থনীতিকে নতুন শক্তি দেওয়া, সুন্দরবন রক্ষা করা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। এসব লক্ষ্য অর্জনের বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছে এই প্রকল্পের মাধ্যমে। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, পরিবেশগত সংবেদনশীলতা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ঘটাতে হবে। বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে পদ্মা সেতু যেমন আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠেছে, তেমনি পদ্মা ব্যারেজও হতে পারে পানি-স্বাধীনতা ও টেকসই উন্নয়নের এক নতুন মাইলফলক। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো একে স্মরণ করবে এমন একটি জাতীয় উদ্যোগ হিসেবে, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানিসংকট দূর করে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিবে।
লেখক :
রবিউস সানি জোহা
শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড জিওগ্রাফী বিভাগ,
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া -৭০০৩