গলা পানিতে কয়লা সংগ্রহে ১২০ অতি দরিদ্র নারী
দিনাজপুর জেলা প্রতিনিধি : দূর থেকে দেখলেই মনে হয়, একদল নারী ড্রেনের কালো ময়লা পানির স্রোতের মধ্যে কি যেনো খুঁজছেন অথবা মাছ ধরার চেষ্টা করছেন। কারও হাতে লম্বা লাঠি, আর বেশিরভাগ নারীই ডুবে রয়েছেন বুকসম পানিতে। কাছে গিয়েই জানা যায়, তারা খুঁজছেন তাদের জীবন ও জীবিকা। তীব্র শীত, প্রবল বর্ষণ কিংবা যেকোন প্রতিকূল আবহাওয়ায় এভাবেই ড্রেনের ময়লা কালো পানিতে দিন-রাত জীবনযুদ্ধে লিপ্ত তারা।
এই দৃশ্য দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ময়লাযুক্ত পানি নিষ্কাশনের ড্রেনের। ড্রেন দিয়ে খনির ভেসে আসা কয়লার ডাস্ট (গুড়া) সংগ্রহ করেই জীবন ও জীবিকা চলে অতি দরিদ্র এসব নারীদের। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির দক্ষিণপাশে প্রাচীর ঘেষে রয়েছে একটি ড্রেন। ভূগর্ভ থেকে কয়লা উত্তোলন এবং শোধনের পর এই ড্রেন দিয়েই খনির ভেতরের ময়লা কালো পানি নিষ্কাশন করে খনি কর্তৃপক্ষ। এই ময়লা পানি দিয়েই ভেসে আসে কয়লার ডাস্ট। আর পালাক্রমে এই ডাস্ট কয়লা সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে খনি এলাকার অন্তত ১২০ জন অতি দরিদ্র নারী।
সম্প্রতি কয়লা সংগ্রহ অবস্থায় কথা হয় কয়লা খনির পার্শ্ববর্তী চৌহাটি গ্রামের কুলসুম বেগমের সাথে। এখানে কিভাবে কয়লা সংগ্রহ করছেন? জানতে চাইলে কুলসুম বেগম বলেন, নেট সেলাই করে ড্রেনের পিলারের সাথে বেঁধে রাখি। পানির সাথে কয়লার ময়লা ভেসে যাওয়ার সময় সেগুলো নেটে আটকা পড়ে। মাঝে মাঝে বাঁশের মাথায় লোহার তৈরি বিশেষ অস্ত্র দিয়ে ড্রেনের পানিতে থাকা ময়লা কাটি। এভাবে সবাই মিলে দল বেঁধে কাজ করি।
অপর নারী শ্রমিক রাজিয়া খাতুন বলেন, দিনমজুর স্বামী মসলেম উদ্দীন মারা গেছে ১০/১২ বছর আগে। এরপর একটি মেয়ে সন্তান নিয়ে মানুষের বাড়িতে কাজ করেছেন। পরে এখানেই কয়লা সংগ্রহ করে সংসার চালাচ্ছেন। তিন বছর আগে মেয়ে মসলেমার বিয়েও দিয়েছেন।
তারা জানান, আশপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রায় ১২০ জন নারী মিলে সমবায়ভিত্তিক তারা এই কাজ করেন দীর্ঘ ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে। এই ১২০ জনের মধ্যে ২০/২৫ জন করে মোট আটটি দলে বিভক্ত হয়ে দিনে-রাতে পালাক্রমে তারা এই ময়লা পানিতে নেমে ডাস্ট কয়লা সংগ্রহ করেন।
তাদের কথায় প্রতিটি দল সপ্তাহে একদিন করে কয়লা সংগ্রহের সুযোগ পায়। টানা ২৪ ঘণ্টা সময় থাকে কয়লা সংগ্রহের জন্য। এই সময় তারা ওই পানিতে থাকেন। তবে ২৪ ঘণ্টায় দু’টি দলে ভাগ হয়ে একদল দিনে আর একদল রাতে কয়লা সংগ্রহ করে।
প্রতিটি দল কোনো দিন ৭/৮ মণ আবার কোনো দিন ১০/১২ মণ কয়লাও পেয়ে থাকেন। সংগৃহীত কয়লা পরে ৪শ’ থেকে ৫শ’ টাকা মণ দরে বিক্রি করেন। এসব কয়লা ইটভাটা চালুর সময় একটু বেশি দামে অর্থ্যাৎ ৭শ’ থেকে ৮শ’ টাকা মণ দরেও বিক্রি হয়। এতে করে প্রতিটি দলের সদস্য জনপ্রতি দিনে ৪শ’ থেকে ৫শ’ টাকা পান। দলগত কাজ করায় মাসে তিনদিন কয়লা সংগ্রহ করতে পারেন।
ব্যবসায়ী ইমরান আলী বলেন, তাদের কাছ থেকে ২০ মণ কয়লা কিনলে শুকানোর পর ৩ মণ কমে যায়। তবে ইটভাটায় এই কয়লার চাহিদা বেশ থাকায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা টন দরে এই কয়লা ইটভাটা মালিকদের কাছে বিক্রি করেন।
এই কয়লা সংগ্রহ করে জীবন-জীবিকা চললেও দিন-রাত পানিতে থেকে নানান রোগে আক্রান্ত হন তারা। দূষিত ও উষ্ণ পানিতে দীর্ঘক্ষণ কাজের কারণে চর্মরোগ, সংক্রমণ ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তাদের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু নেই কোনো স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো, নেই শ্রমিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। এ ব্যাপারে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাইলে তারা কিছু বলতে রাজি হননি।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/173502