আমিরাতে ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ

আমিরাতে ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিশুদের সুরক্ষার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে কঠোর নিয়ম চালু করেছে। নতুন বিধান অনুযায়ী ১৫ বছরের নিচে কেউ আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করতে পারবে না।

এই নিয়ম বাস্তবায়নে টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, ফেসবুক এবং এক্সকে ১২ মাস সময় দেওয়া হয়েছে তাদের সিস্টেম পরিবর্তন করার জন্য। এই সময়ের মধ্যে প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে বয়স যাচাইব্যবস্থা আরো কঠোর করতে হবে এবং শিশুদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপন বন্ধ বা সীমিত করতে হবে। যদি তারা এই নিয়ম মানতে ব্যর্থ হয়, তাহলে প্রশাসনিক শাস্তি ও দেশে কার্যক্রম সীমিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

এই সিদ্ধান্তের ফলে হাজার হাজার পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আগে থেকেই যেসব শিশুর অ্যাকাউন্ট রয়েছে, সেগুলো কী হবে বা তারা কি অভিভাবকের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে লগইন করতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্ল্যাটফর্মগুলোকে যা করতে হবে

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, ফেসবুক এবং এক্সকে নির্ভরযোগ্য বয়স যাচাইব্যবস্থা চালু করতে হবে। এর মধ্যে সরকারি ডিজিটাল আইডি, বায়োমেট্রিক যাচাই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বয়স অনুমান পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। এ ছাড়া ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের আলাদা অ্যাকাউন্ট খুলতে দেওয়া যাবে না এবং বয়স লুকিয়ে রাখার বা নিয়ম এড়ানোর চেষ্টা হলে তা শনাক্ত ও বন্ধ করতে হবে।


প্ল্যাটফর্মগুলোকে অভিভাবকের নিয়ন্ত্রণের সুবিধা, শিশুদের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়মিত মূল্যায়ন এবং স্বচ্ছতা রিপোর্ট জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও মানতে হবে।
১৫ থেকে ১৬ বছর বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য আরো কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকবে। তাদের ক্ষেত্রে ব্যবহার সীমা, স্ক্রিন-টাইম নিয়ন্ত্রণ, অপরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত করা, মেসেজিং ও লাইভস্ট্রিমিংয়ে নিয়ন্ত্রণ এবং অ্যালগরিদমিক সুপারিশ সীমিত করার মতো ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

শাস্তি

নিয়ম ভাঙলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে। তবে নতুন সিদ্ধান্তে আলাদা কোনো নির্দিষ্ট জরিমানার তালিকা উল্লেখ করা হয়নি।


বরং শিশু সুরক্ষাসংক্রান্ত ডিজিটাল কাঠামোর অধীনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হাতে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে।
এই নিয়ম বাস্তবায়ন ও তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দেশটির জাতীয় গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষ এবং টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল সরকার নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষকে। এই দুই সংস্থা নিয়ম না মানলে সতর্কবার্তা দেওয়া, আংশিক বা পুরোপুরি প্ল্যাটফর্ম ব্লক করা, এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশাসনিক জরিমানা আরোপ করার ক্ষমতা পাবে। তবে এসব ব্যবস্থা ধাপে ধাপে  প্রয়োগ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

বিদ্যমান অ্যাকাউন্ট

বর্তমানে ১৫ বছরের কম বয়সী যেসব শিশুর ইতিমধ্যে নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলোতে অ্যাকাউন্ট রয়েছে, সেই অ্যাকাউন্টগুলো আর অনুমোদিত হবে না। তাদের অ্যাকাউন্টগুলো অবশ্যই প্ল্যাটফর্মগুলোকেই নিষ্ক্রিয় করতে হবে। ১৫ থেকে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুরা অ্যাক্সেস রাখতে পারবে, তবে শুধু উন্নত সুরক্ষাব্যবস্থার অধীনে। অফিশিয়াল গেজেটে এই প্রস্তাবনাটি প্রকাশের পর প্ল্যাটফর্মগুলোকে তাদের সিস্টেমগুলো অভিযোজিত করতে এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণগুলো পর্যায়ক্রমে চালু করার জন্য ১২ মাস পর্যন্ত একটি রূপান্তরকালীন সময় দেওয়া হয়েছে।

এই প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, অনেক শিশু ইতিমধ্যেই দৈনন্দিন জীবনের অংশ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে। তাই হঠাৎ করে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা না দিয়ে ধাপে ধাপে পরিবর্তন আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার কমানোর জন্য বাস্তবসম্মত নির্দেশনা এবং পরিবারগুলোর জন্য সহায়তা ব্যবস্থা রাখা হবে। পাশাপাশি অভিভাবকদের জন্য সচেতনতামূলক উপকরণ, গাইডলাইন এবং স্বাস্থ্যকর ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তোলার টুলস দেওয়া হবে।

শিশুদের জন্য বিকল্প হিসেবে খেলাধুলা, সৃজনশীল কাজ, শিক্ষা কার্যক্রম এবং বয়স উপযোগী নিরাপদ ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হবে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো শিশুদের ডিজিটাল ব্যবহার এবং বাস্তব জীবনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বিকাশমূলক কার্যক্রমের মধ্যে একটি স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য তৈরি করা, যাতে তারা ধীরে ধীরে নতুন অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে।

অভিভাবকের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার

এই প্রস্তাবনাটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে আগেই থাকা কিছু বিকল্প ব্যবহার ঠেকানো যায়। এতে বলা হয়েছে, প্ল্যাটফর্মগুলোকে এমন অ্যাকাউন্ট শনাক্ত ও বন্ধ করতে হবে, যেগুলো নিয়ম ভেঙে ব্যবহার করা হচ্ছে, এর মধ্যে শিশুদের এমন অ্যাকাউন্টও আছে যেগুলো তারা বাবা-মা বা অভিভাবকের প্রোফাইল ব্যবহার করে চালাচ্ছে।

এই কাঠামোতে মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর, যাতে নিয়ম এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হয়। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, বাড়িতে অভিভাবকরাও দায়িত্বশীল থাকবেন যাতে শিশুদের জন্য তৈরি সুরক্ষা ব্যবস্থা সহজে ভাঙা না যায়। এ ছাড়া স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৫ বছরের নিচে শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতিও এই নিষেধাজ্ঞার ব্যতিক্রম হিসেবে গণ্য হবে না।

কোনো ট্র্যাকিং বিজ্ঞাপন নয়

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে শিশুদের লক্ষ্য করে ট্র্যাকিং-ভিত্তিক বিজ্ঞাপন ও আচরণভিত্তিক প্রোফাইলিং সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, শুধু বয়সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং প্ল্যাটফর্মগুলো যেভাবে দীর্ঘদিন ধরে শিশু ও কিশোর ব্যবহারকারীদের ডেটা ব্যবহার করে আয় করে আসছে, সেটিও বন্ধ করতে হবে।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী বয়স যাচাই ব্যবস্থা চালাতে হলে ন্যূনতম তথ্য সংগ্রহ করতে হবে এবং তা নিরাপদভাবে ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনের বাইরে সংবেদনশীল তথ্য সংরক্ষণ করা যাবে না।

এ ছাড়া সরকারি ডিজিটাল আইডি, পরিচয়পত্র যাচাই, বায়োমেট্রিক মিলকরণ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বয়স অনুমান, এই পদ্ধতিগুলো গ্রহণযোগ্য হিসেবে ধরা হয়েছে। তবে যথাযথ যাচাই ছাড়া শুধু ব্যবহারকারীর নিজের বলা বয়স গ্রহণযোগ্য হবে না।

এই কাঠামোটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে শিশু বা পরিবারের গোপনীয়তা লঙ্ঘন না করে কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়। এই প্রস্তাব গেজেটে প্রকাশের পর কার্যকর হবে এবং প্ল্যাটফর্মগুলোকে নতুন নিয়ম মানতে ১২ মাস সময় দেওয়া হয়েছে। আগামী দিনে কর্তৃপক্ষ এর পূর্ণ বাস্তবায়ন কাঠামো ও প্রয়োগ পদ্ধতি ঘোষণা করবে।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/173445