ডিপফেক ও ভয়েস ক্লোনিং সাইবার সুরক্ষায় নতুন আতঙ্ক
মোঃ রেজাউল করিম রাজু : আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্মার্টফোন থেকে শুরু করে বড় করপোরেট ডেটাবেস—সবখানেই এর বিচরণ। প্রযুক্তির এই উৎকর্ষ আমাদের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি সাইবার অপরাধীদের হাতে তুলে দিয়েছে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রার এক হাতিয়ার। সাম্প্রতিক সময়ে এআই ভয়েস ক্লোনিং এবং ডিপফেক প্রযুক্তি সাইবার নিরাপত্তায় বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে, যা সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আইটি প্রফেশনাল সবার জন্যই চিন্তার বিষয়।
ভয়েস ক্লোনিং প্রযুক্তি মূলত ডিপ লার্নিং এবং নিউরাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মানুষের গলার স্বর হুবহু নকল করতে পারে। কয়েক বছর আগেও কারও কণ্ঠস্বর নিখুঁতভাবে নকল করতে দীর্ঘ সময়ের অডিও রেকর্ডের প্রয়োজন হতো। কিন্তু প্রযুক্তির বর্তমান যুগে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের একটি সাধারণ অডিও ক্লিপ ব্যবহার করেই যে কারও গলার স্বর ক্লোন করা সম্ভব। সোশ্যাল মিডিয়া বা ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম থেকে সংগ্রহ করা ছোট অডিও ক্লিপ অপরাধীদের জন্য যথেষ্ট। এরপর টেক্সট টু স্পিচ অ্যালগরিদমের মাধ্যমে সেই ক্লোন করা কণ্ঠ দিয়ে যেকোনো কথা বলিয়ে নেওয়া যায়। এই কৃত্রিম কণ্ঠের উচ্চারণ এবং আবেগ এতটাই বাস্তবসম্মত হয় যে, আসল-নকলের পার্থক্য বোঝা প্রায় অসম্ভব।
কেবল কণ্ঠস্বর নয়, ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে সম্পূর্ণ ভুয়া ভিডিও। রিয়েল টাইম ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন ভিডিও কলেও অন্যের চেহারা ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে। অর্থাৎ, মেসেজিং অ্যাপে ভিডিও কলে আপনি হয়তো দেখছেন পরিচিত কেউ কথা বলছে, কিন্তু স্ক্রিনের ওপারে বসে আছে একজন প্রতারক। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া খবর ছড়ানো এবং প্রতারণার মতো সাইবার অপরাধ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রযুক্তির অপব্যবহার এক ভয়াবহ রূপ নিতে শুরু করেছে। ই-কমার্স খাত এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের দ্রুত প্রসারের সুযোগ নিচ্ছে প্রতারক চক্র। প্রতারকরা এখন ভয়েস ক্লোনিং ব্যবহার করে টার্গেট করা ব্যক্তির আত্মীয় বা পরিচিত মানুষের কণ্ঠে ফোন করে জরুরি বিপদের কথা বলে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। যেহেতু ফোনের অপর প্রান্তের কণ্ঠটি একেবারে পরিচিত, তাই অনেকেই যাচাই না করেই টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
একইভাবে, ই-কমার্স বা অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্মগুলোতেও প্রতারণার নতুন ধরন দেখা যাচ্ছে। ভুয়া কাস্টমার প্রোফাইল তৈরি করে পণ্য অর্ডার করা এবং পরবর্তীতে তা রিসিভ না করার মতো ঘটনা ঘটছে। এসব ক্ষেত্রে এআই জেনারেটেড ভয়েস ব্যবহার করে কুরিয়ার বা ডেলিভারি ম্যানের সাথে কথা বলা হচ্ছে, যা মার্চেন্টদের জন্য আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ ধরনের প্রতারণা ঠেকাতে এখন সেন্ট্রালাইজড ডেটাবেস এবং অটোমেটেড ফ্রড ডিটেকশন সিস্টেমের প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে অনেক বেশি।
ব্যক্তি পর্যায়ের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রেও এটি একটি বড় হুমকি। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন কর্মী যাচাইয়ের জন্য ভয়েস বায়োমেট্রিক্স ব্যবহার করে। অপরাধীরা ক্লোন করা কণ্ঠ ব্যবহার করে হোস্টিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা কন্ট্রোল প্যানেল বাইপাস করার চেষ্টা করছে। কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কণ্ঠ নকল করে আইটি বা অ্যাকাউন্টস বিভাগকে ভুয়া নির্দেশনা দিয়ে সার্ভারের অ্যাক্সেস নেওয়া বা ফান্ড ট্রান্সফারের মতো ঘটনাও ঘটছে। এই ধরনের সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং আক্রমণ প্রতিরোধ করা প্রচলিত ফায়ারওয়াল বা সাধারণ সিকিউরিটি প্যাচ দিয়ে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এই নতুন প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সমাধানের চেয়ে ব্যবহারকারী পর্যায়ে সচেতনতা বেশি জরুরি। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:
ফোনে পরিচিত কেউ হঠাৎ বিপদের কথা বলে টাকা বা সার্ভারের সেনসিটিভ ডেটা চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। কলটি কেটে দিয়ে নিজে থেকে সেই ব্যক্তিকে বা তার আশেপাশের কাউকে কল করে বিষয়টি যাচাই করতে হবে।
পরিবারের সদস্য বা অফিসের গুরুত্বপূর্ণ টিমের মধ্যে একটি সেফ ওয়ার্ড বা গোপন সংকেত ঠিক করে রাখা যেতে পারে। সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে সেই গোপন শব্দ জানতে চাইলে প্রতারকদের সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব।
যেকোনো সার্ভার বা ডেটাবেসে লগইনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র পাসওয়ার্ডের ওপর নির্ভর না করে টু ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন বা মাল্টি ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
অচেনা নম্বর থেকে আসা কল রিসিভ করে অপ্রয়োজনে কথা বলা কমানো উচিত। আপনার সামান্য কথার অডিও রেকর্ড করেই স্ক্যামাররা ভয়েস প্রোফাইল তৈরি করে ফেলতে পারে।
তথ্যপ্রযুক্তির এই দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে অটোমেশন বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এড়িয়ে চলার কোনো সুযোগ নেই। আগামী দিনে টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তির ব্যবহার জানতেই হবে। তবে ডিজিটাল জগতে নিজের এবং প্রতিষ্ঠানের তথ্যের সুরক্ষায় আমাদের আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। প্রযুক্তিগত স্বাক্ষরতা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করাই হলো আগামী দিনের সাইবার হুমকি থেকে সুরক্ষিত থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/173211