নামাজে খুশু-খুজু অর্জনের উপায়

নামাজে খুশু-খুজু অর্জনের উপায়

নামাজের জন্য খুশু-খুজু বা একাগ্রতা অপরিহার্য। খুশু-খুজুকে নামাজের প্রাণ বলা হয়। যে নামাজে খুশু-খুজু নেই, তা এক নিস্প্রাণ কাঠামোর মতো। খুশু-খুজুবিশিষ্ট নামাজ বান্দার জীবনের সমস্ত গুনাহ মুছে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যখন নামাজের সময় হয় এবং কোনো ব্যক্তি সুন্দরভাবে ওজু করে একাগ্রতার সাথে উত্তমরূপে রুকু-সিজদা করে নামাজ আদায় করে, তখন তার এই নামাজ পূর্ববর্তী সব সগিরা গুনাহের কাফফারা হয়ে যায়, যতক্ষণ-না সে কোনো কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয়। আর এই সুযোগ তার সারা জীবনের জন্য। (সহিহ মুসলিম: ২২৮)

খুশু-খুজুর দুটি অংশ রয়েছে: বাহ্যিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ স্থির রাখা এবং অভ্যন্তরীণ মনোযোগ ও একাগ্রতা রক্ষা করা। নামাজে কীভাবে খুশু-খুজু অর্জন করবেন, এ সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো।

বাহ্যিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ স্থির রাখা

নামাজে খুশু অর্জনের প্রথম ধাপ হলো শরীর ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে স্থির রাখা এবং অনর্থক নড়াচড়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা। যেমন, হাত, পা বা শরীরকে নামাজের বাইরের কোনো কাজে ব্যবহার না করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, যেন সাতটি অঙ্গের ওপর সিজদা করা হয় এবং নামাজে চুল বা কাপড় না গুটানো হয়। (সুনানে আবু দাউদ: ৮৮৬)

বিখ্যাত তাবেঈ মুজাহিদ (রাহ.) বলেন, হজরত আবু বকর (রা.) ও আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) যখন নামাজে দাঁড়াতেন, তখন স্থিরতার কারণে তাঁদের দেখে মনে হতো, যেন একটি কাঠ মাটিতে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদকে (রা.) নামাজে দেখে মনে হতো, যেন একটি পড়ে থাকা স্থির কাপড়। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা: ৭৩২২)

নামাজরত অবস্থায় এদিক-সেদিক তাকানো খুশু-খুজুর পরিপন্থী। আম্মাজান আয়েশা (রা.) রাসুলুল্লাহর (সা.) কাছে নামাজে এদিক-সেদিক তাকানোর ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা হলো শয়তানের ছোঁ মারা, যা দ্বারা শয়তান আল্লাহর বান্দাদের নামাজ থেকে গাফেল ও উদাসীন করে ফেলে। (সহিহ বুখারি: ৭৫১)

নামাজে যতক্ষণ বান্দা অন্য দিকে দৃষ্টি না দেয়, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি সর্বক্ষণ রহমতের দৃষ্টি রাখেন; কিন্তু বান্দা দৃষ্টি ফেরালে আল্লাহ তাঁর রহমতের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন। তাই দাঁড়ানো অবস্থায় দৃষ্টি সর্বদা সিজদার জায়গাতেই নিবদ্ধ রাখা সুন্নত।

নামাজের ভেতরে যেভাবে মনোযোগ ঠিক রাখবেন

১. হুজুরে দিল বা অন্তরের উপস্থিতি

এটি নামাজের ভিত্তি। নামাজে দাঁড়ানোর পর দুনিয়াবি সব চিন্তা দূরে ঠেলে এই অনুভূতি জাগ্রত করা যে, আল্লাহ আমাকে দেখছেন। হাদিসে জিবরিলে আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তুমি এমনভাবে ইবাদত করো, যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ। আর তুমি যদি আল্লাহকে না-ও দেখো, তবে মনে করো আল্লাহ তো অবশ্যই তোমাকে দেখছেন। (সহিহ বুখারি: ৫০, সহিহ মুসলিম: ৮)

২. তিলাওয়াত ও আজকারের অর্থ বোঝা

নামাজে সুরা ফাতিহা, তাসবিহ ও দোয়াসহ যা কিছু পাঠ করা হয়, তা বিশুদ্ধ উচ্চারণে পড়ার পাশাপাশি তার অর্থ বোঝার চেষ্টা করা উচিত। অর্থের দিকে খেয়াল রাখলে অবান্তর চিন্তা অন্তরে স্থান পায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন, স্পষ্টভাবে ধীরে ধীরে কুরআন তিলাওয়াত করো। (সুরা মুজ্জাম্মিল: ৪) রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজে প্রতিটি সুরা তারতিল সহকারে ধীরস্থিরভাবে তিলাওয়াত করতেন। (সহিহ মুসলিম: ৭৩৩)

নামাজে আল্লাহর সামনে বিনীতভাবে দাঁড়ানোর নির্দেশ কোরআনে দেওয়া হয়েছে। তাই রুকু-সিজদায় তাড়াহুড়ো না করে ধীরস্থিরতা অবলম্বন করা উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) রুকু-সিজদা পূর্ণাঙ্গভাবে আদায় না করাকে নামাজে চুরি বলে আখ্যা দিয়েছেন। (মিশকাতুল মাসাবিহ: ৮৮৫)

৪. ভয় ও বিদায়ী নামাজের অনুভূতি

নামাজে দাঁড়িয়ে মনে এই ভয় ও চিন্তা আনা যে, এই নামাজই হয়তো আমার জীবনের শেষ নামাজ। রাসুলুল্লাহর (সা.) কাছে এক ব্যক্তি উপদেশ চাইলে তিনি বলেন, তুমি যখন নামাজ পড়ো, তখন জীবনের শেষ নামাজ আদায়কারীর মতো (বিদায়ী নামাজ) নামাজ পড়ো। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪৭১)

৫. কল্যাণ ও রহমতের আশা করা

নামাজ হলো আল্লাহর সাথে বান্দার একান্তে কথোপকথন। তাই বান্দা যখন নামাজে দাঁড়ায়, সে মূলত তার রবের সাথে সরাসরি কথা বলে। এজন্য দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহ আমার প্রতিটি রুকু, সিজদা ও দোয়ায় সাড়া দিচ্ছেন এবং এর মাধ্যমে আমার ওপর আল্লাহর রহমত ও কল্যাণ বর্ষিত হচ্ছে।

৬. অন্তরে লজ্জা নিয়ে আসা

নিজের কৃত পাপ, অবাধ্যতা ও ত্রুটির কথা স্মরণ করে মহান রবের সামনে দাঁড়ানোর সময় অন্তরে লজ্জাবোধ তৈরি করা। এই লজ্জার কারণে একজন অপরাধীর মতো মস্তক সামান্য অবনত রেখে বিনীতভাবে আল্লাহর দরবারে হাজিরা দেওয়া উচিত।

নামাজের ভেতর কখনো অনিচ্ছাকৃতভাবে অন্য খেয়াল চলে গেলে কোনো ক্ষতি নেই; তবে নিয়ম হলো, স্মরণ হওয়ামাত্রই অলসতা না করে পুনরায় মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে হবে। স্মরণ হওয়ার পরও ইচ্ছা করে অন্য কিছু ভাবতে থাকা বা অনর্থক চিন্তার বিস্তার ঘটানো কোনোভাবেই উচিত নয়।

নামাজের বাইরেও আল্লাহর কাছে নামাজে একাগ্রতা অর্জনের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা উচিত। এ ছাড়া সাহাবা, তাবেঈ ও বুজুর্গদের নামাজের খুশু-খুজুর ঘটনা পাঠ করাও এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। তবে তাঁদের অতি উচ্চ স্তরের ঘটনা দেখে হতাশ হওয়ার কারণ নেই; কেননা খুশুর বিভিন্ন স্তর

রয়েছে এবং আন্তরিক চেষ্টা জারি রাখলে আল্লাহর অনুগ্রহে ধীরে ধীরে উচ্চস্তরের একাগ্রতা অর্জন সম্ভব।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে খুশু-খুজুর সাথে নামাজ আদায়ের তাওফিক দান করুন। আমিন।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/173118