ভূগর্ভস্থ বালু উত্তোলন হুমকির মুখে জনজীবন
এগিয়ে যাচ্ছে মানুষ, মানুষের প্রয়োজনে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধনে তৈরি হচ্ছে রাস্তাঘাট ব্রীজ কালভার্ট। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানার ভবন নির্মাণে অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যের নাম বালু। এই বালুর বিকল্প উৎস আজও আবিষ্কার হয়নি এমনকি আগামীতেও হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবেই যোগান আসে এই বালু। আজ থেকে ৪০/৫০ বছর আগে যখন এতো বহুতল দালান, রাস্তা, কালভার্ট, ব্রীজ তৈরির প্রয়োজন হয়নি তখন দেখা গেছে নদী খাল বিল থেকে বিশেষ উপায়ে একটু একটু করে বালু উত্তোলন করা হতো। যথেষ্ট পরিশ্রমের কাজ হলেও ওই ভাবে উত্তোলন করা বালু দিয়ে চাহিদা পুরোন হতো। দিন যতো গড়িয়েছে মানুষের প্রয়োজনে সবকিছুর নির্মাণ যেমন বেড়েছে তার সাথে তাল মিলিয়ে বালুর চাহিদাও বেড়েছে। চাহিদার পরিমাণ অতিরিক্ত হওয়ায় পুরানো পদ্ধতি বাদ দিয়ে আধুনিক পদ্ধতি যা অতি কম পরিশ্রমে অধিক পরিমাণ বালু মেশিনের সাহায্যে যত্রতত্র উত্তোলনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শুরুতে অল্প কিছু মানুষ এই কাজে জড়িত ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা হওয়ায় শহর বন্দর গ্রামে অসংখ্য মানুষ জড়িয়ে পড়েছে এই ব্যবসার সাথে। ভূগর্ভস্থ থেকে এই ভাবে বালু উত্তোলনে ক্ষতির চিন্তা প্রথমাবস্থায় কেউই করেনি ঠিকই কিন্তু একটা পর্যায়ে যখন মারাত্মক ক্ষতি প্রত্যক্ষ করা শুরু করলো তখন এই ব্যবসার প্রসার এতোটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যা বন্ধ করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।
একই জায়গায় ভূগর্ভস্থ থেকে মাসের পর মাস এমন কি বছরের পর বছর ধরে বালু উত্তোলনে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে এবং ইতিমধ্যে বেশকিছু জায়গায় এই ক্ষতিসমূহ প্রত্যক্ষ করেছে অত্র এলাকার জনগণ। বালু উত্তোলনে ভূমির স্থিতিশীলতা নষ্ট হয় যেমন বালু যেখানে থেকে তোলা হয় সেখানে মাটির নীচের অংশ ফাঁকা হয়ে যায় যার ফলে মাটি তার নিজস্ব ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে তাই ভূমিধসের সৃষ্টি হয়। এমন দৃশ্য দেশে বেশকিছু জায়গায় হঠাৎ কয়েক মুহূর্ত সময়ের মধ্যে বিশাল এলাকাজুড়ে এমন ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে এবং দেখা গেছে ঐ স্থানে তলদেশ অনেক গভীরে যা পরিমাপ করা সম্ভব হয়নি বেশীরভাগ ক্ষেত্রে। বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশে বালু উত্তোলন করায় ভূগর্ভস্থের খালি হওয়া এলাকাজুড়ে ভূমিকম্পে কঠিন ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়াও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে প্রচুর অর্থ ব্যয়ে তৈরি করা বহুতল ভবন, রাস্তাঘাট ও বড় বড় সেতু ও আবাসভূমি। পানির অপর নাম জীবন আর সেই সুপেয় পানি মাটির নীচে বালুর মাঝে ধরে রাখে প্রকৃতির নিয়মে। বালু উত্তোলনে দিনদিন নেমে যাচ্ছে পানির স্তর। একসময় যেখানে সাধারণ নলকূপ দিয়ে মাটির ২৫/৩০ ফুট নীচে অতি সহজে পানি পাওয়া যেতো, অথচ এখন কমপক্ষে ৯০/১০০ ফুট আবার কোথাও ৩/৪ শত ফুট নীচে তাও আবার শক্তিশালী মেশিনের সাহায্যে পানি তুলতে হয়। ভূগর্ভস্থ সব জায়গার বালু এক নয়, কোথাও আয়রন কম আবার কোথাও মাত্রারিক্ত আয়রন বেশি, ফলে আয়রন বেশি এলাকার বালু নির্মাণ কাজে ব্যবহার করলে অল্প কিছুদিনের মধ্যে ঘরের ছাদ ও দেওয়ালের পলেস্তারে লোনা ধরে নষ্ট হয়ে ভবনকে করে দুর্বল। নদীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বালু উত্তোলন করায় নদীর তলদেশের স্বাভাবিক গভীরতার ব্যাঘাত ঘটে এবং অস্বাভাবিক গভীরতার সৃষ্টি হয় তাই বর্ষা মৌসুমে নদী ভাঙনের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। নদী ও মাটির নীচে থাকে এমন কিছু জীব ও উদ্ভিদ যা বালুর উপর নির্ভরশীল। বালু তোলায় হারিয়ে যাচ্ছে ঐ সকল জীব ও উদ্ভিদ আর পরিবেশ হারাচ্ছে তার স্বাভাবিকতা। ফসল উৎপাদনে পানি অপরিহার্য, একটা সময় দেখা যেতো জমির কোনো ৫/৭ ফুট কুপ খনন করে রাখলে কয়েক ঘন্টার মধ্যে পানি জমা হতো আর সেই পানি জমিতে সেচ কাজে ব্যবহার হতো। আজ ঐসব দৃশ্য কল্পনাতীত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকৃতির এই স্বাভাবিকতা হারিয়ে যাওয়ার পেছনে একমাত্র দায়ী ভূগর্ভস্থ থেকে অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলন। তাই এই বালু ব্যবসায়ীদের কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে নাম দিয়েছে বালু খেকো।
অবকাঠামোগত উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে গেলে বালুর বিকল্প নাই বলেই সরকার থেকে প্রতিবছর অভিজ্ঞ মহলের জরিপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু জায়গা চিহ্নিত করে বালু মহাল নামে লীজ দিয়ে থাকে। বালু খেকোরা টেন্ডারের মাধ্যমে সরকারের চাহিদা মাফিক টাকা পরিশোধ করে বালু মহাল লীজ নেয়। আর এখানেই শুরু হয় বালু খেকো দের তেলেসমাতি কারবার। একটা লীজের বিপরীতে অসংখ্য জায়গায় বালু উত্তোলনের অবৈধ ব্যবসা শুরু করে দেয়। তাদের দেখাদেখি লীজ না নিয়েও অসংখ্য বালু খেকোর আবির্ভাব ঘটে যথেষ্ট লাভজনক ব্যবসা হওয়ায়। দেশের আনাচে-কানাচেতে বালু খেকো দের মাঝে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার কারণে মারামারি কখনোবা খুনখারাপির কথা হরহামেশাই শোনা যায়। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝে মধ্যে অবৈধ এই ব্যবসা রোধ কল্পে অভিযানে নামে। বালু উত্তোলনের সরঞ্জাম জব্দ করে কখনোবা ধ্বংস করে আবার আটক করে জেল-জরিমানা দিয়ে থাকে। তখন সাময়িক বন্ধ থাকে কিন্তু মাস না পেরুতে ধাপেধাপে সবাইকে খুশি করে বীরদর্পে ফিরে আসে পুরানো ব্যবসায়। বালু খেকো এরা সর্বদা ক্ষমতাধর কারো না কারো আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে থাকে। তাই কোনো সমস্যা কে তারা সমস্যা মনে না করে সবার মন রক্ষা করে নির্বিঘ্নে নিশ্চিন্তে চালিয়ে যাচ্ছে অবৈধ বালুর ব্যবসা আর হুমকির মুখে ফেলছে জনজীবন, জনপদ, পরিবেশ ও প্রকৃতি।
লেখক :
শাব্বীর পল্লব
প্রাবন্ধিক ও গবেষক
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/172922