যৌতুক প্রথা বিলুপ্ত হয়নি: বদলেছে কৌশল

যৌতুক প্রথা বিলুপ্ত হয়নি: বদলেছে কৌশল

গ্রাম বাংলায় একটা প্রচলিত প্রবাদ আছে, শাক দিয়ে মাছ ঢাকা অর্থাৎ যে কোনো জিনিস বা কাজ যা আছে তাই থাকবে শুধু তাকে কিঞ্চিত পরিবর্তন করা হবে যাতে মানুষকে বোকা বানানো যায়। বর্তমান সমাজে এই প্রবাদটা যেন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে যৌতুক একটি পুরনো সামাজিক ব্যাধি। আইনের চোখে এটি দন্ডনীয় অপরাধ হলেও সমাজে এখনো এর রূপ পাল্টে টিকে আছে। সরাসরি যৌতুক দাবি করলে সামাজিক চাপ কিংবা আইনি ঝুঁকিতে পড়তে হয়, তাই অনেক পরিবার একে উপহার বা আনুষ্ঠানিক উপহার বলে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে। 

যৌতুক আমাদের সমাজের এক মারাত্মক ব্যাধি, যা থেকে রেহাই পাওয়া সহজ নয়। সভ্যতার আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত মানুষ যৌতুক দেয়া এবং নেয়ার প্রথাকে বন্ধ করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবুও যৌতুক প্রথা বিলুপ্ত না হয়ে নতুন রূপে ফিরে এসেছে। বর্তমানে যৌতুক দেয়া এবং নেয়া আইনগত অপরাধ। তাই এখন যৌতুক শব্দের পরিবর্তন হয়েছে উপহার শব্দের দ্বারা। বর্তমানে বিবাহের ক্ষেত্রে যৌতুক শব্দের ব্যবহার না করে কনেপক্ষ বরপক্ষকে খুশি হয়ে নানান সামগ্রী প্রদান করে, যা জোগাড় করতে গিয়ে কনেপক্ষকে হিমশিম খেতে হয়। বরপক্ষ এই লেনদেনকে যৌতুক হিসেবে চিহ্নিত না করে কনেপক্ষ থেকে দেয়া উপহার হিসেবে চিহ্নিত করে। কনেপক্ষ লোকলজ্জার ভয়ে উপহার নামের আড়ালে যৌতুক দিতে বাধ্য হয় এবং বরপক্ষ তা উপহার হিসেবে সাদরে গ্রহণ করেন। বাংলাদেশে যৌতুক এখনো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি হিসেবে বিদ্যমান। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী প্রতিবছর শত শত নারী যৌতুক-সংক্রান্ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান বলছে, ওই বছর অন্তত ৩,০০০ এর বেশি নারী যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ২০০ জন নারীকে হত্যা করা হয়েছে অথবা তারা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন।  গ্রামীণ অঞ্চলে এ প্রবণতা বেশি হলেও শহরেও যৌতুকের চাপ পরিবার ধ্বংস করছে। তবে এখনকার বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই যৌতুককে উপহারের নাম দেয়া হয়েছে। যার কিনা আইনগতভাবে কোনো শাস্তি নেই। সমাজের প্রচলিত ধারার চাপে পড়ে মানুষ প্রতিনিয়ত এসকল সামাজিক ব্যাধিতে লিপ্ত হচ্ছে । তবে এই সামাজিক ব্যাধি যে দিন দিন মারাত্মক রূপ ধারণ করছে তা সম্পর্কে কারো ধারণা নেই। বর্তমান সমাজের উপহার নামক যৌতুক নেওয়ার ধরনের পেছনে কিছু কারণ রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হলো সামাজিক চাপ ও প্রথাগত বিশ্বাস। দীর্ঘদিনের প্রথা হিসেবে অনেকেই মনে করেন বিয়েতে মেয়ের পরিবারকে কিছু দিতে হবে। সমাজে এই মানসিকতা এখনো বিদ্যমান। আইন এড়িয়ে যাওয়ার জন্য যৌতুকের পরিবর্তে উপহার শব্দটি ব্যবহৃত হয়। যৌতুকবিরোধী আইন থাকলেও উপহারের নামে দেওয়া-নেওয়া প্রমাণ করা কঠিন। ফলে অনেকেই আইন এড়াতে এ কৌশল নেয়। অর্থনৈতিক অসাম্য সৃষ্টির ফলে ছেলে পক্ষকে উচ্চতর ভাবা হয়, তাই মেয়ে পক্ষ উপহার দিয়ে সম্মান রক্ষা করে বলে মনে করে। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হওয়া যৌতুকের অন্যতম প্রধান কারণ। শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়লেও মানসিকতার পরিবর্তন হয়নি। তাই একই বিষয়কে নতুন নামে চালানো হচ্ছে। 

সমাজের মারাত্মক ব্যাধি যৌতুক যাকে কিনা উপহার হিসেবে পরিচালনা করা হচ্ছে, তার প্রভাব কমিয়ে আনতে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যেমনঃ সকলের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। পরিবার ও সমাজে বোঝাতে হবে যে উপহার দিয়ে আসলে যৌতুককেই বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। বিয়েতে দেওয়া-নেওয়া সম্পদের সঠিক হিসাব ও নজরদারি করতে হবে। প্রয়োজনে শাস্তি বাড়াতে হবে। সামাজিক সহযোগিতার মাধ্যমে যৌতুক দেয়া এবং নেয়া পরিবারকে বর্জন করতে হবে। যে পরিবার যৌতুক নেয় বা দেয়, তাদের সামাজিকভাবে নিরুৎসাহিত করতে হবে। শিক্ষা ও মূল্যবোধ চর্চা করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে যৌতুককে লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখতে শেখাতে হবে। দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে হবে যাতে যৌতুক বা উপহার ছাড়া বিয়ের নজির তৈরি হলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। 

যৌতুক এখন উপহার নামে প্রচলিত হলেও এর প্রকৃতি মোটেও বদলায়নি। মূল সমস্যা হলো সামাজিক মানসিকতা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য। পরিবারগুলো মনে করে বিয়েতে কিছু দেওয়া সামাজিক মর্যাদা রক্ষার অংশ, আবার অনেকে সরাসরি দাবি করলেও উপহার বলে চালিয়ে দেয়। এতে আইনকেও এড়ানো যায়, সমাজেও সম্মান অক্ষুন্ন থাকে। কিন্তু আসলে এটি এক ধরনের প্রতারণা কারণ স্বেচ্ছায় দেওয়া উপহার আর জোরপূর্বক নেওয়া জিনিস এক নয়। মানুষের মাঝে যদি সমাজের মারাত্মক ব্যাধি যৌতুক যা এখন উপহার নামে পরিচালিত হচ্ছে তার ভয়াবহতা না বুঝে তবে সুদূর ভবিষ্যতে এর প্রভাব আরো ভয়ানক হবে। 

লেখক :

নুসরাত জাহান (স্মরনীকা)

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/172688