নতুন বাজেট তরুণদের জন্য কী বার্তা বহন করে
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেবল অর্থনীতির আকার, অবকাঠামো প্রকল্পের সংখ্যা কিংবা রপ্তানি আয়ের পরিমাণ দ্বারা নির্ধারিত হবে না। বরং তা নির্ভর করবে দেশের কোটি কোটি তরুণ-তরুণী কতটা দক্ষতা, সুযোগ ও সক্ষমতা অর্জন করতে পারছে তার ওপর। একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে হলে মানবসম্পদ উন্নয়নই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। এই প্রেক্ষাপটে বাজেট ২০২৬-২৭ এর যুব ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট দিকগুলো বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। যদিও বাজেট নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে মূল্যস্ফীতি, করনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, তবুও দীর্ঘমেয়াদে এই বাজেটের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে এটি কতটা কার্যকরভাবে তরুণদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে পারে তার ওপর।
বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখেরও বেশি তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগদাতারা অভিযোগ করে আসছেন যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া অনেক গ্র্যাজুয়েটের একাডেমিক যোগ্যতা থাকলেও তাদের মধ্যে কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও), অটোমেশন, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা শ্রমবাজারের চাহিদাকে দ্রুত পরিবর্তন করছে। ফলে শ্রেণিকক্ষ থেকে সরাসরি কর্মসংস্থানে প্রবেশের প্রচলিত পথটি আগের তুলনায় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই বাজেট ২০২৬-২৭ মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। শিক্ষা খাতে ১.৩৬ ট্রিলিয়ন টাকার বরাদ্দ শুধু পরিমাণগত দিক থেকে নয়, নীতিগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাজেটের লক্ষ্য কেবল শিক্ষা বিস্তার নয়, বরং শিক্ষাকে আরও কর্মমুখী ও ভবিষ্যৎ-উপযোগী করে তোলা। বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া। বহু বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় সমস্যা হচ্ছে “স্কিল মিসম্যাচ”- –অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা যা শিখছে এবং শিল্পখাত যা চায় তার মধ্যে অসামঞ্জস্য। ফলে একদিকে শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের সম্প্রসারণ এই সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একইসঙ্গে ডিজিটাল লার্নিং অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়াও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমান বিশ্বে সফটওয়্যার উন্নয়ন, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল সেবাভিত্তিক অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এই খাতগুলোতে প্রতিযোগিতা করতে হলে তরুণদের ডিজিটাল দক্ষতা অর্জন অপরিহার্য। তাই ডিজিটাল শিক্ষায় বিনিয়োগকে শুধু শিক্ষা সংস্কার নয়, বরং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সক্ষমতার ভিত্তি হিসেবেই দেখা উচিত। বাজেটের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হলো বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের প্রস্তাব। বাংলাদেশের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী শুধুমাত্র আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এই উদ্যোগ সেই বাধা দূর করতে সহায়ক হতে পারে।
তবে এই নীতির গুরুত্ব শুধু শিক্ষার্থীদের বিদেশে পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং দক্ষতার আদান- প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে শিক্ষালাভকারী তরুণরা দেশে ফিরে উন্নত জ্ঞান, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং পেশাগত নেটওয়ার্ক নিয়ে আসতে পারে, যা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। কিন্তু বাজেটে সুযোগ সৃষ্টি করাই যথেষ্ট নয়; তরুণদেরও সেই সুযোগ গ্রহণে সক্রিয় হতে হবে। বর্তমান যুগে শুধু ডিগ্রি অর্জনই সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। ডিজিটাল দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, নেতৃত্বগুণ এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ক্রমশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই শিক্ষার্থীদের উচিত নিজেদের দক্ষতা উন্নয়নের প্রতি আরও মনোযোগী হওয়া। একইসঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত শিল্পখাতের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা গড়ে তোলা, যাতে পাঠ্যক্রম বাস্তব কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় ইন্টার্নশিপ, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ এবং বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করা জরুরি।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বাস্তবায়ন নিয়ে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে উচ্চাকাক্সক্ষী পরিকল্পনার অভাব নেই, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা প্রায়ই কাক্সিক্ষত ফলাফল অর্জনে বাধা সৃষ্টি করে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি তখনই কার্যকর হবে যখন তা প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার মান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। বিদেশে উচ্চশিক্ষার ঋণ কর্মসূচিকে হতে হবে স্বচ্ছ, সহজলভ্য ও মেধাভিত্তিক। কারিগরি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শিল্পখাতের চাহিদা অনুযায়ী সাজাতে হবে। ডিজিটাল শিক্ষা উদ্যোগকে শহরকেন্দ্রিক না রেখে গ্রামীণ এলাকায়ও পৌঁছে দিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সৃজনশীল ও বিশ্লেষণধর্মী শিক্ষার দিকে অগ্রসর হতে হবে।
সবশেষে, বাজেট ২০২৬-২৭ একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যকে স্বীকার করেছেÑবাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। এই জনমিতিক সুবিধা চিরস্থায়ী নয়। সঠিক বিনিয়োগ ও নীতি সহায়তা পেলে এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী চালিকা শক্তিতে পরিণত হতে পারে; অন্যথায় তা বেকারত্ব ও সামাজিক চাপের উৎসও হয়ে উঠতে পারে। শ্রেণিকক্ষ থেকে কর্মজীবনে সফল উত্তরণই আগামী দশকে বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। বাজেট ২০২৬-২৭ সেই যাত্রাপথের একটি সম্ভাবনাময় রূপরেখা তুলে ধরেছে। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং দেশের তরুণরা সেগুলোকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কতটা সমৃদ্ধ করতে পারে।
লেখক :
শাদমান ফরহাদ সাবা
গবেষক ও প্রাবন্ধিক