২০২৬-২৭ এর বাজেটে জন আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটুক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপিত হয়েছে বৃহস্পতিবার। দীর্ঘ সময় পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), আর সরকারের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফলে এই বাজেটকে ঘিরে জনমনে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ, প্রত্যাশা ও কৌতূহল। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সামনে আজ শুধু একটি সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্বই নয়; বরং একটি নতুন প্রত্যাশার বাংলাদেশের রূপরেখা নির্মাণেরও সুযোগ রয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, প্রতিকূলতা ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে উঠে আসা এই নেতৃত্বের কাছে দেশের মানুষের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। জনগণ বিশ্বাস করতে চায় যে তাঁর নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে সাধারণ মানুষের জীবনমান, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, সুশাসন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কেবল নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক দলিল নয়; এটি হবে সরকারের উন্নয়ন-দর্শন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও। দেশের মানুষ এমন একটি বাজেট প্রত্যাশা করে, যেখানে উন্নয়নের মাপকাঠি হবে মানুষের জীবনমানের উন্নতি, কর্মসংস্থানের সম্প্রসারণ, শিক্ষার মানোন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিস্তার। আজ দেশের সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতির চাপ, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, চিকিৎসা ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং শিক্ষার ক্রমবর্ধমান খরচের সঙ্গে লড়াই করছে। আন্তর্জাতিক অর্থনীতির অস্থিরতা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, জ্বালানি ও খাদ্যবাজারের অনিশ্চয়তাও অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে জনগণের জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের একটি টেকসই ভিত্তি নির্মাণ করা। একটি প্রকৃত জনকল্যাণমুখী বাজেটের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত শিক্ষা। কারণ শিক্ষাই মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি এবং একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতির সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। একইভাবে স্বাস্থ্য খাতেও প্রয়োজন যুগান্তকারী উদ্যোগ। মানসম্মত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত না হলে উন্নয়নের সুফল কখনোই সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। এই জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষতা এবং উদ্ভাবনী অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়ানো অপরিহার্য। পাশাপাশি কৃষি খাতে ভর্তুকি, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, কৃষি গবেষণা এবং জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তির বিস্তারও সময়ের দাবি। একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি করতে হবে। বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা কর্মসূচি আরও বিস্তৃত ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। একই সঙ্গে সংস্কৃতি, ক্রীড়া, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে একটি সৃজনশীল, উদ্ভাবনী ও মানবিক সমাজ গঠনের পথ সুগম করতে হবে।স্থানীয় সরকার, গ্রামীণ উন্নয়ন, নারী ও শিশু উন্নয়ন খাতেও বিশেষ গুরুত্ব প্রয়োজন। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার সুফল রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের জীবনেও সমানভাবে প্রতিফলিত হয়। আজ দেশের মানুষ শুধু নতুন প্রকল্পের ঘোষণা শুনতে চায় না; তারা তাদের জীবনের বাস্তব সমস্যার সমাধান দেখতে চায়। তারা চায় সন্তানের জন্য উন্নত শিক্ষা, পরিবারের জন্য সাশ্রয়ী চিকিৎসা, তরুণদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান, কৃষকের জন্য ন্যায্যমূল্য এবং দুর্বল মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার জনগণ। সেতু, মহাসড়ক কিংবা সুউচ্চ ভবন উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও সেগুলো কখনোই উন্নয়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। উন্নয়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন, মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং সম্ভাবনার বিকাশ। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন সময় এসেছে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও মানবিক উন্নয়নের মধ্যে একটি সুষম ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার।
সেই কারণেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ঘিরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। দেশের মানুষ বিশ্বাস করতে চায়, তাঁর নেতৃত্বে প্রণীত প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট কেবল সংখ্যার হিসাব হবে না; এটি হবে একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নপত্র যেখানে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে মানুষ, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য হবে জনগণের কল্যাণ, এবং যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত হবে সামাজিক ন্যায়বিচার, সমতা ও মানবিক মর্যাদা। যদি এই বাজেট শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, কৃষি, সংস্কৃতি ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ খাতগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়, তবে তা শুধু একটি অর্থবছরের বাজেট হিসেবেই নয়, বরং নতুন বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবেও ইতিহাসে স্থান করে নিতে পারে।
লেখক:
রাকিবুল ইসলাম
প্রাবন্ধিক ও গবেষক।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/172447