জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে সন্ন্যাসতলী’র শতবর্ষী ঘুড়ি মেলায় মানুষের ঢল

জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে সন্ন্যাসতলী’র শতবর্ষী ঘুড়ি মেলায় মানুষের ঢল

ক্ষেতলাল (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি : বাংলা জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ শুক্রবার জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার মামুদপুর ইউনিয়নের মহব্বতপুর গ্রাম ঘেঁষে তুলশীগঙ্গা নদীর অদুরে সন্ন্যাসতলীর বটতলায় এক’শ বছর পূর্বে থেকে শুরু হয়েছিল ঘুড়ি মেলার উৎসব। সেই কৃষ্টি আজও ধরে রেখেছেন সন্ন্যাসতলী এলাকার ৫০ গ্রামের মানুষ। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল শুক্রবার সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সন্ন্যাসতলী ঘুড়ি উৎসবের মেলা শেষ হয়েছে।

দিনক্ষণ মনে রেখে সময়মত দোকানিদের পাশাপাশি দর্শনার্থীরা ভিড় জমান নিভৃত পল্লীর এই ঐতিহ্যবাহী মেলায়। এ মেলার বৈশিষ্ট ছিল অনাদিকাল থেকেই মেলার দিন অন্তত একপশলা বৃষ্টি হওয়ার। কিন্তু এবার তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। এবার বৃষ্টি না হওয়ার পাশাপাশি মেলায় ছিল প্রচন্ড গরম ও দাবদহ। তার পরেও এ মেলায় হাজার হাজার নারী ও পুরুষের ঢল নামে।

এলাকার প্রবীণদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সন্ন্যাসতলীর এই ঘুড়ি উৎসব শুরুর দিন বিকেলে বটতলায় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায় সন্ন্যাস পূজা প্রতিবারের ন্যায় এই বারও পালন করেন। তাদের এই পূজা অর্চনাকে ঘিরেই মূলত এ মেলার উৎপত্তি ঘটে। তবে এর গোড়া পত্তনের কথা কেউ বলতে পারেননি। প্রবীণরা শুধু এটুকু জানিয়েছেন এক’শ বছরেরও বেশী সময় ধরে তারা এ মেলার আয়োজন দেখে আসছেন।

মেলার নিজস্ব কোন জায়গা না থাকলেও বর্তমানে এর ব্যাপ্তি প্রায় ২ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে দেখা গেছে। প্রচন্ড গরম তাপদাহ উপেক্ষা করে একদিনের এ মেলাকে ঘিরেই জেলার জামালগঞ্জ চারমাথা থেকে ঐতিহাসিক আছরাঙ্গাদীঘি পর্যন্ত প্রায় ২ কিলোমিটার বিভিন্ন রকমারি দোকানের পাশাপাশি সকল সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরদের শুভাগমন চোখে পড়ার মত।

মাত্র কয়েক ঘন্টার স্থায়ী এ মেলায় সাংসারিক বিভিন্ন আসবাবপত্র থেকে শুরু করে ছোট মাছ ধরার বাঁশের তৈরিকৃত পণ্য খলসানি সহ, টোপা, ডালা, চালুন এবং সুতার তৈরি তৌরা জাল, গৃহস্থলী কাজে ব্যবহৃত দ্রব্যাদি, বিভিন্ন খেলনা, মিষ্টান্ন দ্রব্যাদি, প্রসাধনিক কসমেটিক সামগ্রী, মাটির তৈজসপত্র সহ সহস্রাধিক দোকানি মেলায় এসেছিলেন তাদের জিনিষপত্র বিক্রির জন্য।

শিশুদের মনোরঞ্জনের জন্য ছিল নাগরদোলার ব্যবস্থাও। আর মেলার বড় আকর্ষনই হলো ঘুড়ি উড়ানো ও বিক্রি। পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা থেকে ঘুড়ি ব্যবসায়ীরা এসেছিলেন ঘুড়ি বিক্রি করতে। তবে প্রচন্ড গরমের পাশাপাশি কোন হাওয়া বাতাস না থাকায় আকাশে ঘুড়ি উড়ানোর যে প্রতিযোগিতা হওয়ার কথা এবার সে আয়োজন অনেকটা কম ছিল। হাজার হাজার দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্য মেলায় সার্বক্ষণিক আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের টহলও জোরদার ছিল।

বগুড়ার দুপচাঁচিয়া, ঝালঘরিয়া গ্রামের রেজাউল, আদমদীঘি উপজেলার শিববাটি গ্রামের ঘুড়ি ব্যবসায়ী সালাম হোসেন বলেন, সন্ন্যাসতলী ঘুড়ির মেলা বড় হওয়ায় তিনি ছুটে এসেছেন ঘুড়ি বিক্রির জন্য। মেলায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ঘুড়ি বিক্রি করতে পেরে তিনি অত্যন্ত খুশী। জয়পুরহাটের পার্বতীপুর এলাকার ঘুড়ি ব্যবসায়ী মফিজ উদ্দিন, মজনু সরদার বলেন, পূর্ব পুরুষের আমল থেকেই এ মেলার নাম শুনেছি।

মেলা উদযাপন ও পূজা কমিটির সদস্য মহব্বতপুর গ্রামের মন্টু মন্ডল বলেন, মেলাটি হিন্দু সম্প্রদায়ের হলেও এটি আসলে হিন্দু-মুসলমান সহ অন্যান্য ধর্মালম্বীদের মিলনমেলায় পরিনত হয়েছে। মামুদপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মিলন হোসেন বলেন, একদিনের মেলায় যে এত লোক সমাগম হতে পারে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

তিনি আরও বলেন, মেলায় যেন কোন অনৈতিক আসর না বসে এর ঐতিহ্যকে ভুলুন্ঠিত করতে না পারে সে ব্যাপারে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ক্ষেতলাল থানার ওসি মুক্তারুল হক বলেন, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং মেলায় আসা দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে ছিল।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/172377