শব্দদূষণ: এক অদৃশ্য ঘাতক ও আমাদের বাঁচার লড়াই
বর্তমান সভ্যতায় আমরা আধুনিকতার চরম শিখরে আরোহণ করলেও, সুস্থভাবে বেঁচে থাকার মৌলিক উপাদানগুলো ক্রমেই হারিয়ে ফেলছি। বায়ুদূষণ বা পানিদূষণ নিয়ে আমাদের কিছুটা উদ্বেগ থাকলেও ‘শব্দদূষণ’ নামক অদৃশ্য ঘাতকটি নিয়ে আমাদের সচেতনতা এখনো তলানিতে। অথচ আন্তর্জাতিক শব্দসচেতনতা দিবস ২০২৬-এর মূল প্রতিপাদ্য আমাদের এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে “আর নয় শব্দদূষণ, চাই সুস্থ জীবন”। এ সংক্রান্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি সচেতনতামূলক পোস্টারে দেখা যায়, একটি শিশু কান চেপে ধরে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে আছে। এই দৃশ্যটি কেবল একটি ছবি নয়, বরং আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আর্তনাদের প্রতিফলন। শব্দদূষণ এখন আর কেবল শহরের সমস্যা নয়, এটি ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামগঞ্জেও। অকারণে হর্ন বাজানো আমাদের দেশের চালকদের এক মরণনেশায় পরিণত হয়েছে। হাসপাতালের সামনে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে কিংবা নিরিবিলি আবাসিক এলাকায় উচ্চশব্দে হর্ন বাজানো যেন একটি সাধারণ সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা ভুলে যাই যে, একটি তীব্র হর্ন একজন হৃদরোগীর মৃত্যু ঘটাতে পারে কিংবা একটি শিশুর শ্রবণশক্তি চিরতরে নষ্ট করে দিতে পারে। পোস্টারের তথ্যমতে, শব্দদূষণ কেবল শ্রবণশক্তিই নষ্ট করে না, এটি মেধা বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে শিশুদের মানসিক ও বুদ্ধি বিকাশে উচ্চ শব্দ এক ভয়াবহ অন্তরায়।

আরেকটি বড় উপদ্রব হলো মাইকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক সভা কিংবা সামাজিক উৎসব—সবক্ষেত্রেই উচ্চশব্দে মাইক বাজানোকে আমরা বীরত্ব মনে করি। অন্যের বিরক্তির কারণ হয়ে কোনো উৎসব পালন করা যে শিষ্টাচারবহির্ভূত, এই বোধটুকু আমাদের সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। গভীর রাত পর্যন্ত উচ্চশব্দে গান-বাজনা বা মাইকের ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি। এর ফলে উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, এবং তীব্র মানসিক অবসাদ সৃষ্টি হয়।
শুধু মাইক বা হর্ন নয়, উৎসবের নামে বাজি-পটকা ফোটানো আমাদের পরিবেশের শান্ত অবস্থাকে বিষিয়ে তোলে। এই বাজি-পটকা কেবল শব্দদূষণই ঘটায় না, এটি অগ্নিকান্ডের ঝুঁকি বাড়ায় এবং পাখিসহ অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি করে। পোস্টারে সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শব্দদূষণ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে। শব্দাতঙ্কিত হয়ে অনেক সময় বন্যপ্রাণী ও পাখিরা তাদের আবাসস্থল ছেড়ে চলে যায়, যা আমাদের বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য নষ্ট করছে। তবে শব্দের এই সন্ত্রাসের ঊর্ধ্বে রয়েছে আরও বড় এক আতঙ্ক গুলি ও বোমার শব্দ। আমরা এমন এক পৃথিবী চাই যেখানে শব্দের অর্থ হবে সুর, আর্তনাদ নয়। পৃথিবীর বুক থেকে গুলি ও বোমার গর্জন বন্ধ হওয়া জরুরি। বারুদের গন্ধ আর কামানের গর্জনহীন একটি শান্ত পৃথিবীই পারে মানুষের স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করতে। শান্তি ও নিস্তব্ধতা মানুষের অধিকার, এটি কোনো বিলাসিতা নয়। পরিবেশ অধিদপ্তর এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশীদারিত্বমূলক প্রকল্প গ্রহণ করেছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু কেবল আইন করে বা সরকারি প্রচারণা চালিয়ে এই দানবকে ঠেকানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন গণসচেতনতা। ‘আসুন শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট হই’ এই আহ্বানকে আমাদের প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিতে হবে।
আমাদের করণীয়: ১. অকারণে হর্ন বাজানোর অভ্যাস ত্যাগ করা এবং বিশেষ করে হাইড্রোলিক হর্ন নিষিদ্ধ করা। ২. জনসমাবেশে বা উৎসবে মাইকের শব্দের মাত্রা সীমিত রাখা। ৩. আতশবাজি বা বাজি-পটকার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। ৪. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে শব্দদূষণের কুফল সম্পর্কে নিয়মিত আলোচনা করা।
পরিশেষে বলতে চাই, শব্দদূষণ মুক্ত পরিবেশ আমাদের করুণা নয়, বরং সাংবিধানিক অধিকার। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি মেধাভিত্তিক ও সুস্থ সমাজ গড়তে হলে আমাদের আজই শব্দের এই আগ্রাসন রুখতে হবে। মনে রাখতে হবে, নীরবতা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার পরম ঔষধ। আমরা হর্নমুক্ত সড়ক, মাইকমুক্ত শান্ত জনপদ এবং বোমা-গুলিহীন এক শান্তিময় পৃথিবী চাই। তবেই সার্থক হবে আমাদের আন্তর্জাতিক শব্দসচেতনতা দিবসের অঙ্গীকার।
লেখক :
হাসান মো: শাব্বির
সাংবাদিক-প্রাবন্ধিক
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/172045