ডাকসুর আট মাস : প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তবায়ন কম, হতাশ শিক্ষার্থীরা
ঢাবি প্রতিনিধি: আবাসনসংকট নিরসন, হলের খাবারের মানোন্নয়ন, প্রশাসনিক সংস্কার, গবেষণার পরিবেশ উন্নয়ন, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত সুযোগ-সুবিধা—এমন নানা প্রতিশ্রুতি নিয়েই ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল ছাত্রশিবির-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট। ৩৬ দফার ইশতেহার ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল ব্যাপক প্রত্যাশা। তবে নির্বাচনের আট মাস পেরিয়ে গেলেও ইশতেহারের উল্লেখযোগ্য অংশ বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় হতাশা প্রকাশ করছেন অনেক শিক্ষার্থী।
দীর্ঘ ছয় বছর পর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ছিল, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা আবাসন, প্রশাসনিক জটিলতা, পরিবহন ও একাডেমিক সমস্যাগুলোর সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবে নবনির্বাচিত নেতৃত্ব। কিন্তু শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের মতে, এখন পর্যন্ত সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম পুরোনো সমস্যা হল ক্যানটিনের খাবারের মান। ইশতেহারে পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকা প্রণয়ন, নিয়মিত মান নিয়ন্ত্রণ এবং মানসম্মত ক্যাফেটেরিয়া চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। বাস্তবে কিছু হলে সীমিত পরিবর্তন দেখা গেলেও অধিকাংশ শিক্ষার্থীর অভিযোগ, খাবারের দাম বৃদ্ধি পেলেও মানের উন্নয়ন হয়নি।
ডাকসুর জিএস এস এম ফারহাদ বলেন, “ইশতেহারের বিভিন্ন বিষয় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমরা ধারাবাহিকভাবে কাজ করছি। হলের খাবারের মানোন্নয়ন, আবাসনসংকট নিরসন, পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক সেবার আধুনিকীকরণ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে।” তবে শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
মাস্টারদা সূর্য সেন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মাহিম হাসান বলেন, “নির্বাচনের পর খাবারের দাম বেড়েছে, কিন্তু মান বাড়েনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। অভিযোগ জানিয়েও কার্যকর পরিবর্তন দেখতে পাইনি।”
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শুধু খাবারের মান নয়, হলগুলোর সামগ্রিক পরিবেশও এখনো সন্তোষজনক নয়। অনেক হলে ওয়াশরুমের অপর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতা, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং আবাসনসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা বিদ্যমান রয়েছে।
সিট-সংকটের সমাধান এখনো অধরা :
আবাসিক হলের সিট-সংকট এখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বড় সমস্যা। বিশেষ করে ছাত্রীদের জন্য এ সংকট আগের মতোই প্রকট। নির্বাচনের আগে প্রথম বর্ষ থেকেই বৈধ সিট নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। যদিও অনাবাসিক ছাত্রীদের জন্য মাসিক তিন হাজার টাকা ভাতা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, অনেকের মতে এটি সমস্যার তুলনায় অপ্রতুল। এদিকে নতুন হল নির্মাণের একাধিক প্রকল্প অনুমোদন পেলেও সেগুলোর বাস্তব কাজ এখনো শুরু হয়নি।
প্রশাসনিক সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই :
ডাকসুর অন্যতম আলোচিত প্রতিশ্রুতি ছিল ‘পেপারলেস রেজিস্ট্রার বিল্ডিং’ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ চালু করা। তবে আট মাসেও এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। শিক্ষার্থীরা বলছেন, নথি যাচাই, সনদ উত্তোলন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে এখনো দীর্ঘসূত্রতা ও ভোগান্তি রয়েছে। সম্প্রতি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সময়মতো না পাওয়ায় কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ হারানোর ঘটনাও প্রশাসনিক দুর্বলতাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
গবেষণা ও একাডেমিক উন্নয়নেও ধীরগতি :
ইশতেহারে গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি, আধুনিক গবেষণাগার স্থাপন এবং গ্রন্থাগার ডিজিটালাইজেশনের মতো প্রতিশ্রুতি ছিল। তবে শিক্ষার্থীদের মতে, এসব ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। একই সঙ্গে কিছু শিক্ষকের একাডেমিক দায়বদ্ধতার অভাব, কার্যকর মেন্টরশিপ ব্যবস্থার অনুপস্থিতি এবং বিতর্কিত নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী মোরসালিন ইসলাম বলেন, “নির্বাচনের আগে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবতার সঙ্গে তার বড় ধরনের ফারাক দেখা যাচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। অনেকের কাছেই মনে হচ্ছে, ইশতেহারের বড় অংশ এখনো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।”
প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক :
ডাকসুর বর্তমান মেয়াদ শেষ হতে আর কয়েক মাস বাকি। এই সময়ে বিভিন্ন কর্মসূচি ও কার্যক্রম পরিচালিত হলেও শিক্ষার্থীদের মতে, মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধানে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। ফলে নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রশ্ন এখন ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, সমস্যা নতুন নয়; নতুন ছিল সমাধানের অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকারের বাস্তব প্রতিফলনই এখন দেখতে চায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/171913