পরিবেশ দূষণের কবলে চামড়া শিল্প
সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে সরকারের নীতিগত দুর্বলতাগুলো চামড়া খাতটিকে পিছিয়ে রেখেছে। নব্বইয়ের দশক থেকেই হাজারীবাগের ভয়াবহ দূষণ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছিল। ট্যানারিগুলো সরানোর জন্য আদালত, পরিবেশবাদী সংগঠন ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ছিল অনেক চাপ। অবশেষে, ২০০৩ সালে তৎকালীন সরকার চামড়া শিল্পনগরী ঢাকার হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে স্থানান্তরের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৭ সালের মধ্যে এ প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন হয়। এই স্থানান্তরের মূল উদ্দেশ্য ছিল-পরিবেশ দূষণ কমানো ও আধুনিক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ট্যানারি স্থানান্তরের পাশাপাশি দূষণটাও স্থানান্তরিত হয়েছে সাভারে। শুধু পার্থক্য এটুকুই যে, আগে চামড়া শিল্পের বর্জ্যে দূষিত হতো বুড়িগঙ্গা আর এখন দূষিত হয় ধলেশ্বরী নদী। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে বিপুল বিষাক্ত বর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে সলিড ওয়েস্ট, ইটিপি স্লাজ ও ক্রোমিয়াম স্লাজ অন্যতম। এগুলোর নিরাপদ অপসারণের ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত। ফলে, মাটি ও পানি দূষণের ঝুঁকি বেড়েছে। ট্যানারি বর্জ্যে থাকা ভারী ধাতু বিশেষ করে ক্রোমিয়াম মাটিতে জমা হয়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে। ফসলের মধ্যে বিষাক্ত উপাদান প্রবেশ করতে পারে। গবাদিপশু ও মানুষের শরীরে খাদ্যচক্রের মাধ্যমে এই বিষ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এছাড়াও চামড়ার পচন ও বর্জ্য ফেলার কারণে তীব্র দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। বাতাসে অ্যামোনিয়া ও বিষাক্ত গ্যাস ছড়ায়। চামড়া কাটার পর যে উচ্ছিষ্ট অংশ, পশুর লোম, মাংসের টুকরা ও রাসায়নিক মিশ্রিত কাদা তৈরি হয়। এগুলো সঠিকভাবে অপসারণ করা না হলে পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। পরিবেশবিদদের অনেকেই মনে করেন সাভার শিল্প নগরীতে ‘সিইটিপি’ পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যকর না থাকায় আশেপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। এই পরিবেশগত অবস্থা আন্তর্জাতিক মান পূরণ করতে পারেনি। যার কারণে বাংলাদেশের অধিকাংশ ট্যানারি এখনো আন্তর্জাতিক ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিওজি)’-এর সনদ পায়নি। ফলে, বড় আন্তর্জাতিক ব্রান্ডগুলো সরাসরি অর্ডার দিচ্ছে না। এতে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে রপ্তানি আয়।
২০০৫ সালে নাইকি, অ্যাডিডাস ও টিম্বারল্যান্ডের মতো বৈশ্বিক ব্রান্ড ও জুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ‘এলডিব্লিওজি’ প্রতিষ্ঠিত করে। বর্তমানে এই সংস্থার অধীন বিশ্বের নামিদামি প্রায় ১ হাজার ব্রান্ড ও সরবরাহ খাতের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সুতরাং এই সনদ ব্যতীত বিশ্ববাজারে রপ্তানি প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা প্রায় অসম্ভব। সনদবিহীন ট্যানারিগুলো প্রতি বর্গফুট কাঁচা চামড়া বিক্রি করে ৪৫ সেন্ট থেকে ১.৬ ডলারে। অপরদিকে, সনদধারী ট্যানারিগুলো একই চামড়া বিক্রি করে দ্বিগুণেরও বেশি দামে। বাংলাদেশে শুধু ৮টি ট্যানারির ‘এলডিব্লিওজি’ সনদ রয়েছে। মজার বিষয় হলো এই ট্যানারিগুলোর সবগুলোই ‘বিসিক ট্যানারি শিল্পনগরী, সাভার’ এলাকার বাইরে অবস্থিত। কোম্পানিগুলো নিজ উদ্যোগে ইটিপি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলেছে। তাহলে সমস্যা শুধু শিল্পনগরী এলাকার ট্যানারিগুলোতে। এখানে একটি কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ‘সিইটিপি’ করা হয়েছে। বাংলাদেশী ও চীনা কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে এটি বাস্তবায়িত হলেও এর কার্যকারিতা মুখ থুবড়ে পড়েছে। সিইটিপি’র ধারণক্ষমতা ১৪ হাজার ঘনমিটার, যেখানে আমাদের প্রয়োজন ২৫ হাজার ঘনমিটার। কুরবানির সময় ধারণক্ষমতা বেড়ে হয় প্রায় ৪০ হাজার ঘনমিটার। আমাদের ১২ থেকে ১৫টি ট্যানারি সনদ পাওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছে। শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আটকে আছে। সনদপ্রাপ্তির জন্য মোট নম্বর ১৭১০ ধরা হয়। এর মধ্যে কারখানা সংশ্লিষ্ট বিষয় ১৪০০ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৩০০ নম্বর। কারখানা’র বিষয়গুলোতে তারা ভালো করেছে। কিন্তু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটির জন্য ট্যানারিগুলো ‘এলডিব্লিওজি’ সনদ অর্জন করতে পারছে না। এই সনদ দুর্বলতার জন্য আমাদেরকে এখন আধা-প্রক্রিয়াজাত ‘ক্রাস্টলেদার’ চীনের কাছে অর্ধেক দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। যে চামড়া আগে প্রতিবর্গফুট ১.৫ ডলারে বিক্রি হয়েছে। একই চামড়া এখন চীনের কাছে ৬০-৬৫সেন্টে বিক্রি হচ্ছে। ফলে একটি বিপুল পরিমাণ রপ্তানি আয় থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। বাংলাদেশ ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার আয় হারাচ্ছে। ইপিবি’র বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৬-২০১৭অর্থ বছরে চামড়াও চামড়াজাত পণ্যে রপ্তানি আয় ছিল ১২৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অপরদিকে২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে এইখাতে রপ্তানি আয় ১১৪৫.০৭ মার্কিন ডলার। ২০১৬সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত মুদ্রাস্ফীতি প্রায় দেড়গুণের বেশি বেড়েছে। অর্থাৎ ২০১৬ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আমাদের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। আবার বাংলাদেশের চামড়াজাত পণ্য প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো বছরে প্রায় ১৫ কোটি ডলারের ফিনিশড লেদার আমদানি করে থাকে। এতে একদিকে যেমন আমাদের রপ্তানি আয় কমছে, অন্যদিকে ক্রমাগত বাড়ছে আমদানি ব্যয়।
লেখক:
জাকির পারভেজ
ইন্সট্রাক্টর (রসায়ন), ভেড়ামারা টিএসসি,
কুষ্টিয়া