শিক্ষা, সাফল্য ও মানবিকতার সংকট: আমরা কোথায় যাচ্ছি
সম্প্রতি একটি সংবাদ দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। খবরের শিরোনাম থেকে জানা গেল, মিরপুরের একটি বহুতল ভবনে এক প্রবীণ নারীর করুণ পরিণতির ঘটনা। ভদ্রমহিলার এক ছেলে যুগ্ম সচিব, এক ছেলে বুয়েটের শিক্ষক এবং আরেক ছেলে কানাডাপ্রবাসী। সমাজের প্রচলিত মানদন্ডে এটি একটি অত্যন্ত সফল পরিবার। হয়তো কোনো এক সময় সন্তানদের সাফল্যের কারণে তিনি ‘রত্নগর্ভা মা’ হিসেবেও প্রশংসিত হয়েছেন। সামাজিক মর্যাদা, প্রতিষ্ঠা কিংবা আর্থিক সক্ষমতার কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু জীবনের শেষ সময়ে একজন বৃদ্ধ মায়ের সবচেয়ে বড় প্রযোজন ছিল সন্তানের সান্নিধ্য, ভালোবাসা, খোঁজখবর এবং যত্ন, যা অর্থ দিয়ে পুরোপুরি কেনা যায় না।
৭৫ বছর বয়সী এই মা জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছেন নিঃসঙ্গতা ও অবহেলার মধ্যে। ঈদের সময় যখন চারদিকে আনন্দের আমেজ, তখন তিনি একা মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পরও দীর্ঘ সময় তাঁর কোনো খোঁজ নেওয়া হয়নি। ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি আমাদের সমাজের জন্যও এক গভীর আত্মসমালোচনার বিষয়।
সন্তান জন্মের পর একজন মা কত নির্ঘুম রাত কাটান, কত ত্যাগ স্বীকার করেন এবং কত ভালোবাসা দিয়ে সন্তানকে বড় করে তোলেন সেই স্মৃতি যদি আমরা হৃদয়ে ধারণ করতে পারতাম, তাহলে হয়তো বাবা-মায়ের প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধ আরও গভীর হতো। প্রকৃত সাফল্য শুধু পদ-পদবি অর্থ কিংবা সামাজিক অবস্থানে নয়; প্রকৃত সাফল্য নিহিত রয়েছে বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন, তাদের সম্মান করা এবং জীবনের শেষ সময়ে তাদের পাশে থাকার মধ্যে। এই ঘটনা শুধু একটি সংবাদ নয়; এটি আমাদের সময়ের এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এটি এমন একটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে, যা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় আমরা কি সত্যিই উন্নত হচ্ছি, নাকি উন্নতির দৌড়ে মানবিকতার সবচেযে মূল্যবান অংশটুকু হারিয়ে ফেলছি?
আজকের সমাজে সাফল্যের সংজ্ঞা অনেকটাই বদলে গেছে। আমরা সাফল্যকে পরিমাপ করি পদ-পদবি, অর্থ-সম্পদ, ডিগ্রি, বাড়ি-গাড়ি এবং সামাজিক অবস্থানের মাধ্যমে। সন্তান নামী প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলে আমরা গর্ববোধ করি, বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে গেলে আনন্দিত হই, বড় চাকরি পেলে আত্মীয়-স্বজনের কাছে তা গর্বের সঙ্গে প্রচার করি । কিন্তু একই সঙ্গে কি আমরা তাকে একজন ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাও দিচ্ছি? তাকে কি শেখাচ্ছি বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব, বযোজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা, মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং সম্পর্কের মূল্য?
শিক্ষা মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি করে, দক্ষতা বাড়ায় এবং জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ তৈরি করে। কিন্তু শিক্ষা যদি একজন মানুষকে মানবিক করে তুলতে না পারে, তবে সেই শিক্ষার পূর্ণতা কোথায়? একজন ব্যক্তি যত বড় পদেই আসীন হোন না কেন, যদি তিনি নিজের জন্মদাতা মা-বাবার খোঁজ নেওয়ার সময় না পান, তাহলে তাঁর অর্জনের ভেতরে একটি গভীর শূন্যতা থেকেই যায়। বর্তমান সময়ে আমরা সন্তানদের প্রতিযোগিতায় জিততে শেখাচ্ছি, কিন্তু সম্পর্ক রক্ষা করতে শেখাচ্ছি না। আমরা তাদের ক্যারিয়ার গড়তে উৎসাহিত করছি, কিন্তু পরিবারকে সময় দেওয়ার গুরুত্ব কতটুকু বোঝাচ্ছি? আমরা তাদের সফল হতে বলছি, কিন্তু মানবিক হতে বলছি কতটুকু? ফলাফল হচ্ছে আমরা দক্ষ মানুষ তৈরি করছি, কিন্তু সব সময় ভালো মানুষ তৈরি করতে পারছি না। একসময় আমাদের সমাজে যৌথ পরিবার ছিল সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার অন্যতম ভিত্তি। শিশুরা পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের সঙ্গে বেড়ে উঠত এবং ছোটবেলা থেকেই শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ ও পারিবারিক বন্ধনের শিক্ষা পেত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে পরিবার ছোট হয়েছে, নগরায়ণ বেড়েছে, কর্মব্যস্ততা বেড়েছে এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা মানুষের জীবনকে বদলে দিয়েছে। যোগাযোগের মাধ্যম বেড়েছে, অথচ অনেক ক্ষেত্রে হৃদয়ের দূরত্বও বেড়েছে।
আজ মানুষ পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে মুহূর্তের মধ্যে যোগাযোগ করতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তির এই অগ্রগতি সবসময় সম্পর্কের গভীরতা বাড়াতে পারেনি। আমরা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের খবর রাখি, অথচ অনেকেই নিজের বাবা-মাযের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলার সময় বের করতে পারি না। প্রযুক্তি আমাদের সংযুক্ত করেছে, কিন্তু মানবিক সংযোগের বিকল্প হতে পারেনি। বিশেষ করে নগরজীবনে প্রবীণদের একাকীত্ব একটি নীরব সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। কর্মব্যস্ত সন্তানরা জীবিকার প্রয়োজনে দূরে চলে যাচ্ছে। এটি বাস্তবতার দাবি । কিন্তু এই বাস্তবতার মধ্যেও বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ যেন হারিয়ে না যায়। বৃদ্ধ বয়সে মানুষের সবচেয়ে বড় চাহিদা বিলাসিতা নয়; বরং আপনজনের সান্নিধ্য। একটি ফোনকল, একটি খোঁজখবর কিংবা কিছুটা সময়ও তাদের জীবনে নতুন আশার সঞ্চার করতে পারে।
ঈদ, পূজা কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের মূল শিক্ষা হলো সম্পর্কের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করা। পরিবারকে সময় দেওয়া, আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ নেওয়া এবং সমাজের অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু যদি উৎসব কেবল ভোগ-বিলাস কিংবা আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে তার প্রকৃত তাৎপর্য হারিয়ে যায়। উৎসবের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন পরিবারের প্রবীণ সদস্যরাও সেই আনন্দের অংশ হতে পারেন । সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন যে, একটি সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একটি সমাজ কতটা মানবিক, কতটা সহমর্মী এবং কতটা দায়িত্বশীল সেটিও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মানদন্ড। যদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বাড়ে কিন্তু পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আমার মনে হয়, বর্তমান সময়ে সমাজের গভীর সংকটগুলো বিশ্লেষণ ও সমাধানের পথ দেখানোর ক্ষেত্রে সমাজবিজ্ঞানীদের আরও সক্রিয় ও দৃশ্যমান ভূমিকা প্রযোজন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কিংবা অবকাঠামোগত সাফল্যের পাশাপাশি মানবিক সম্পর্ক, পারিবারিক বন্ধন এবং মূল্যবোধের পরিবর্তন নিয়েও আরও বেশি গবেষণা ও জনআলোচনা জরুরি। পরিবার ভাঙনের কারণ, প্রবীণদের একাকীত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের মতো বিষয়গুলো নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আরও গভীর আলোচনা হওয়া দরকার। অন্যথায় উন্নয়নের বাহ্যিক অগ্রগতি সত্ত্বেও সামাজিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি থেকেই যাবে।
এক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশু তার বাবা-মায়ের আচরণ থেকেই প্রথম শিক্ষা লাভ করে। যদি সে দেখে পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করা হয়, তাদের খোঁজ নেওয়া হয় এবং তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে সেও একই মূল্যবোধ নিয়ে বড় হবে। অন্যদিকে, পরিবারেই যদি অবহেলা ও উদাসীনতার পরিবেশ থাকে, তাহলে শিশুর মধ্যেও সেই প্রবণতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোরও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আমাদের পাঠ্যক্রমে নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ব এবং মানবিক আচরণের বিষয়গুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। কেবল পরীক্ষায় ভালো ফলাফলই একজন শিক্ষার্থীর চূড়ান্ত পরিচয় হতে পারে না; তাকে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে ।
রাষ্ট্রেরও কিছু করণীয় রয়েছে। প্রবীণ নাগরিকদের কল্যাণ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং পরিবারভিত্তিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও মানবিক মূল্যবোধ পুনর্জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আমরা প্রায়ই উন্নত রাষ্ট্র গঠনের কথা বলি। কিন্তু একটি উন্নত রাষ্ট্র গড়তে হলে আগে উন্নত মানুষ তৈরি করতে হবে। আর উন্নত মানুষ বলতে শুধু শিক্ষিত বা ধনী মানুষকে বোঝায় না; বোঝায় এমন মানুষকে, যার মধ্যে দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, কৃতজ্ঞতা এবং মানবিকতা রয়েছে ।
প্রতিদিনই নানা ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমাদের সামাজিক কাঠামোর ভেতরে নীরবে এক ধরনের অবক্ষয় বাসা বেঁধেছে । পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে, দায়িত্ববোধ কমছে, মানবিক মূল্যবোধের জায়গায় আত্মকেন্দ্রিকতা বাড়ছে। সমাজের এই ঘুণে ধরা বাস্তবতা শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। আজ যে ঘটনাগুলো আমাদের বিবেককে নাড়া দিচ্ছে, সেগুলো আসলে দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা মূল্যবোধের সংকটের বহিঃপ্রকাশ ।
যদি এখনই পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ, গণমাধ্যম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র সমন্বিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তাহলে সামনে আরও বড় মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে। তাই মানবিক মূল্যবোধ, পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক সংহতি পুনর্গঠনের উদ্যোগ আজ আর কোনো বিলাসিতা নয়; এটি সময়ের অপরিহার্য দাবি। আজ আমরা সন্তান, কাল আমরা বাবা-মা হব। আজ যে অবহেলা আমরা অন্যের জীবনে দেখি, আগামী দিনে সেটি আমাদের জীবনেও ফিরে আসতে পারে। তাই এখনই সময় আত্মসমালোচনার । এখনই সময় নিজেদের প্রশ্ন করার — আমরা কি শুধু সফল মানুষ তৈরি করছি, নাকি ভালো মানুষও তৈরি করছি?
জীবনের প্রকৃত সাফল্য শুধু নিজের অর্জনে নয়; বরং নিজের মানুষদের পাশে থাকার মধ্যেও নিহিত। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাফল্য কোনো পদ-পদবি নয়, কোনো অর্থ-সম্পদ নয়, কোনো ডিগ্রি নয়। সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো এমন একজন মানুষ হওয়া, যার ভালোবাসায় বাবা-মা কখনো নিজেদের পরিত্যক্ত মনে করেন না, যার উপস্থিতিতে পরিবার নিরাপত্তা অনুভব করে এবং যার মানবিকতায় সমাজ আলোকিত হয় ।
মানবিকতা, দায়িত্ববোধ এবং পারিবারিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণই হতে পারে একটি সুস্থ, সুন্দর ও কল্যাণমুখী সমাজ বিনির্মাণের প্রধান ভিত্তি। কারণ একটি সভ্য সমাজের প্রকৃত শক্তি তার উঁচু অট্টালিকায় নয়, তার মানুষের হৃদয়ে লুকিয়ে থাকে । আজকের এই ঘটনা আমাদের জন্য শুধু একটি সংবাদ নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা। এই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করলে হয়তো আমরা আরও আধুনিক হব, আরও ধনী হব, আরও প্রযুক্তিনির্ভর হব; কিন্তু মানুষ হিসেবে আরও একাকী, আরও বিচ্ছিন্ন এবং আরও মানবিকতাশূন্য হয়ে পড়ব ।
হে আল্লাহ, আমাদের সন্তানদের তাদের বাবা-মায়ের যথাযথ খেদমত করার তাওফিক দান করুন। আমাদের জীবদ্দশায় যেন তারা আমাদের সম্মান, ভালোবাসা ও যত্ন করে এবং মৃত্যুর পর আমাদের জন্য দোয়া করার সৌভাগ্য অর্জন করে। আমিন । “রব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগীরা”হে আমার প্রতিপালক, আমার পিতা-মাতার প্রতি দয়া করুন, যেমন তাঁরা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন। সূরা আল-ইসরা, আয়াত ২৪)।
লেখক :
মো. জাহাঙ্গীর আলম
নির্বাহী পরিচালক, গোল্ডেন বাংলাদেশ; সমাজ, রাজস্ব ও পরিবেশ বিশ্লেষক
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/171758