ফুটবল বিশ্বকাপ: সীমানা পেরিয়ে বাঙালির বিশ্বকাপনামা
আকাশে মেঘের মতো উড়ছে আকাশী-সাদা আর সবুজ-হলুদ পতাকা। চায়ের দোকানে কাপ-পিরিচের টুং টাং শব্দের চেয়েও চড়া সুরে বাজছে তর্কের ঝড়। দুয়ারে কড়া নাড়ছে ফুটবল বিশ্বকাপ। আর এই গোল বলটিকে কেন্দ্র করে আমাদের বাঙালি সমাজে যে চিরন্তন আবেগ আর হুজুগ তৈরি হয়, তা এককথায় দেখার মতো। এই এক মাস চিরচেনা মানুষগুলোও যেন একেকজন বিদেশী ভক্তে রূপ নেয়। ফুটবল উৎসবের এই রঙিন চাদরে জড়িয়ে থাকে নিখাদ আনন্দ, আবার এর ওপিঠেই লুকিয়ে থাকে এক অন্ধ সামাজিক অন্ধকার।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও বিশ্বকাপ আসে, কিন্তু সেখানে উৎসবের ধরনটা একটু ভিন্ন। ইউরোপ বা লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে খেলা মানেই স্টেডিয়ামে বসে কিংবা কোনো বড় পর্দার সামনে প্রিয় দলের জার্সি গায়ে চমৎকার একটা সন্ধ্যা কাটানো। ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার মানুষ নিজের দেশের জন্য কাঁদে, হাসে, কিন্তু ভিন্ন দেশের সমর্থক বন্ধুদের সাথে হাত মেলাতেও দ্বিধা করে না। অথচ আমাদের এই দেশে উৎসবের রূপটা বড়ই অদ্ভুত। যে তারকা খেলোয়াড়েরা মানচিত্রে আমাদের দেশটাকে হয়তো চেনেই না, তাদের জন্য আমরা পড়াশোনা নষ্ট করে, ধার-দেনা করে মাইল কে মাইল জুড়ে পতাকা বানাই। ফুটবল মূলত একটি সুন্দর শিল্প। মাঠে প্রিয় তারকার জাদুকরী পায়ের কাজ বা নিখুঁত পাসে বল জালে জড়ানোর মুহূর্তে যে আনন্দ, তা কোটি টাকা দিয়েও কেনা অসম্ভব। গোল হওয়ার পর পাড়া-মহল্লায় একদল মানুষের যে গগনবিদারী চিৎকার আর কোলাকুলি তা এক পরম প্রাপ্তি। আবার প্রিয় দল হেরে গেলে মাঝরাতে টিভির সামনে বসে নীরবে চোখ মোছা নিঃসঙ্গ তরুণের কান্নাটাও এক অদ্ভুত আবেগের অংশ। এই হাসি-কান্নার দোলাচলই তো ফুটবলকে জীবন্ত রাখে।কিন্তু বিপত্তি বাঁধে তখন, যখন এই সুস্থ আনন্দ রূপ নেয় চরম অন্ধত্বে। আমরা অন্যের মতামতকে সম্মান না দিয়ে এবং খেলোয়াড়দের অন্ধ অনুকরণ করতে গিয়ে খেলাকে নিজেদের মর্যাদার লড়াই বানিয়ে ফেলি। চায়ের কাপে শুরু হওয়া সাধারণ তর্কটা সস্তা অহংকারে রূপ নেয়। বর্তমানে এর সাথে যুক্ত হয়েছে ফেসবুক বা টিকটকের উসকানিমূলক পোস্ট ও কুরুচিপূর্ণ ট্রল, যা মাঠের উত্তেজনাকে পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে দেয়। এলাকার কিছু তরুণেরা একে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের হাতিয়ার বানায়। এমনকি ম্যাচকে কেন্দ্র করে অনলাইনে ও অফলাইনে শুরু হয় কোটি কোটি টাকার জুয়া ও বাজির মরণনেশা, যা বহু পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। আর এই অন্ধত্বের শেষ পরিণতি হিসেবে দেখা দেয় তুচ্ছ কারণে হাতাহাতি, মারামারি ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত।সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় আমাদের চিরচেনা সামাজিক সম্পর্কে। যে প্রতিবেশী গভীর রাতে আপনার একটু অসুস্থতায় সবার আগে ছুটে আসে, স্রেফ একটা ভিন্ন দলের গোল খাওয়ার আনন্দে তাকে খোঁচা দিয়ে কথা বলা কতটা যুক্তিযুক্ত? সুদূর পরবাসের দেশের জন্য নিজের আপন ভাই, পরম বন্ধু বা প্রতিবেশীর সাথে কথা বন্ধ করা চরম মূর্খতা। অথচ আমরা বিদেশী দলের জার্সি নিয়ে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিচ্ছি, আর আমাদের নিজেদের দেশের ফুটবল খেলার মাঠগুলো দর্শকশূন্যতায় খাঁ খাঁ করছে।বিশ্বকাপ শেষে বিজয়ী দল ট্রফি উঁচিয়ে ধরে কোটি টাকার বিলাসবহুল জীবনে ফিরে যাবে। কিন্তু খেলার উত্তেজনায় আমরা যে প্রতিবেশী বা বন্ধুর সাথে আজীবনের জন্য সম্পর্ক নষ্ট করছি, দিনশেষে আমাদের সেই চেনা মানুষের বুকেই ফিরে আসতে হবে। পতাকাগুলো রোদে পুড়ে একসময় মলিন হয়ে যাবে, কিন্তু এই হুজুগে পড়ে ভাঙা সম্পর্কের দেয়ালগুলো জোড়া লাগাতে বছরের পর বছর কেটে যাবে। বন্ধুদের সাথে আড্ডা হোক, সুস্থ আলোচনা হোক, কিন্তু তা যেন কোনো দ্বন্দ্বে রূপ না নেয়। আসুন, আমরা প্রতিবেশীর সাথে মধুর সম্পর্ক বজায় রেখে, বন্ধুদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ফুটবল উপভোগ করি। খেলা হোক সম্প্রীতির উৎসব, ভাঙনের নয়।
লেখক :
সুমন পাল
প্রাবন্ধিক
সলঙ্গা, সিরাজগঞ্জ।