নদীভাঙন ও কৃষি ক্ষতি: বড় ক্ষতির ছোট গল্পগুলো

নদীভাঙন ও কৃষি ক্ষতি: বড় ক্ষতির ছোট গল্পগুলো

প্রতি বর্ষায় নদীর জল বাড়ে, সঙ্গে বাড়ে ভাঙনের আতঙ্ক। নদীর পাড় ঘেঁষে থাকা গ্রামগুলোতে এই আতঙ্ক কেবল প্রকৃতির নয় -এটি জীবিকা, খাদ্য নিরাপত্তা আর ভবিষ্যতের প্রশ্ন। একেকটি পরিবারে ভাঙনের অভিঘাত একেক রকম, কিন্তু ক্ষতির গল্পগুলো মিলেমিশে হয়ে ওঠে এক বড় জাতীয় সংকটের প্রতিচ্ছবি। চরাঞ্চল ও নদীপাড়ের কৃষকরা বছরের পর বছর পরিশ্রম করে যে জমিতে ধান, পাট কিংবা সবজি ফলান, এক রাতেই তা বিলীন হয়ে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ভাঙনের আগে কোনো সতর্কবার্তা থাকে না। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখা যায়, গতকালের মাঠ আজ নদীর স্রোতে মিলিয়ে গেছে। এতে শুধু চলতি মৌসুমের ফসল নয়, পরবর্তী চাষাবাদের আশাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। নদীভাঙনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে প্রান্তিক কৃষকদের ওপর। জমি হারালে তারা হয়ে পড়েন ভূমিহীন, বিকল্প আয়ের সুযোগও সীমিত। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে অন্য এলাকায় কাজের সন্ধানে পাড়ি জমান, কেউ আবার ঋণের বোঝায় জর্জরিত হন। একটি পরিবারের এই ক্ষতি ধীরে ধীরে সামাজিক সংকটে রূপ নেয়।

এক বিঘা জমি, এক জীবনের হিসাব কুড়িগ্রামের চরের কৃষক রশিদ আলীর এক বিঘা জমি ছিল তার সম্বল। নদীভাঙনে সেই জমি গেল রাতারাতি। বীজ, সার আর শ্রমে করা বিনিয়োগের কোনো ক্ষতিপূরণ নেই। ব্যাংক ঋণ আছে, ফসল নেই রশিদ আলীর গল্পটি ব্যতিক্রম নয়, বরং সাধারণ। পদ্মার ভাঙন শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার এক সময়ের সমৃদ্ধ জনপদকে বিরানভূমিতে পরিণত করেছে। এখানকার কৃষক সুফিয়া বেগম তার স্বামী ও তিন সন্তান নিয়ে এখন দিশেহারা। তাদের একমাত্র সম্বল ছিল দুই বিঘা ফসলি জমি, যা পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়েছে গত বর্ষায়। সুফিয়া বলেন, “জমির ফসলই ছিল আমাদের বাঁচার একমাত্র উপায়। এখন কী করে খাবো, ছেলেমেয়েদের কী পড়াবো, ভেবে পাচ্ছি না।” সরকারি সহায়তা পেলেও তা তাদের দীর্ঘদিনের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। যমুনার করাল গ্রাসে প্রতি বছরই বিলীন হচ্ছে শত শত একর আবাদি জমি। মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের কৃষক আব্দুল মজিদের চোখে এখন শুধুই হতাশা। গত বছরও তার ৫ বিঘা জমির ফসল ফলিয়েছিল সোনালি স্বপ্ন। কিন্তু এবারের বন্যায় যমুনা গ্রাস করেছে তার সবটুকু। “কীভাবে সংসার চালাবো, কীভাবে ছেলেমেয়ের মুখে খাবার দেবো, কিছুই বুঝতে পারছি না,” ভাঙা কণ্ঠে বললেন মজিদ। 

শুধু মজিদ নন, এমন গল্প এ অঞ্চলের হাজারো কৃষকের। নদীভাঙন তাদের স্বপ্ন কেড়ে নিচ্ছে, ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। কৃষিই যাদের একমাত্র অবলম্বন, তাদের জন্য নদীভাঙন মানে জীবন-জীবিকার ওপর সরাসরি আঘাত। একদিকে জমি হারাচ্ছেন, অন্যদিকে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। সরকার কিছু সহায়তা দিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। নদীভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর সামাজিক বাস্তবতাও বদলে যায়। ভূমিহীন হয়ে পড়া মানুষজন কাজের সন্ধানে শহরমুখী হন। কেউ দিনমজুর, কেউ রিকশাচালক হিসেবে জীবিকা খোঁজেন। এতে গ্রামভিত্তিক কৃষি অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পারিবারিক বন্ধনেও চাপ সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অপরিকল্পিত নদীশাসন এবং প্রাকৃতিক পলির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধার কারণে নদীভাঙন আগের চেয়ে আরও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠছে। অথচ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য স্থায়ী পুনর্বাসন, বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা ও ভাঙনপ্রবণ এলাকায় টেকসই কৃষি পরিকল্পনা এখনও যথেষ্ট নয়। 

নদীভাঙনের প্রতিটি ঘটনা একেকটি ছোট গল্প কিন্তু সবগুলো গল্প মিলেই তৈরি হয় জাতীয় পর্যায়ের বড় ক্ষতি। এই গল্পগুলো শুধু সংবাদ শিরোনামের জন্য নয়, নীতিনির্ধারকদের ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া জরুরি। নইলে নদীর স্রোতের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাবে আরও অসংখ্য মানুষের জীবনের গল্প। 

লেখক:

জান্নাতুল ফেরদাউস অহনা

শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/171487