বগুড়ায় ফুটবল-কূটনীতি, মাঠের চির বৈরিতা ভুলে এক কাতারে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা

বগুড়ায় ফুটবল-কূটনীতি, মাঠের চির বৈরিতা ভুলে এক কাতারে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা

স্টাফ রিপোর্টার : ফুটবল মানেই যেখানে চিরকালীন চিরবৈরী দুই শিবির, সেখানে সম্প্রীতির এক সম্পূর্ণ নতুন সমীকরণ দেখাল বগুড়া। বিশ্বজুড়ে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যকার মাঠের লড়াই এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তীব্র বাকযুদ্ধ যেখানে অবধারিত, সেখানে সেই চেনা ছক ভেঙে এক অনন্য নজির গড়েছেন উত্তরের এই জেলা শহরের ফুটবলপ্রেমীরা।

২০২৬ সালের ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বগুড়ায় প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো দুই পরাশক্তির সমর্থকদের এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক যৌথ আনন্দ শোভাযাত্রা। দুই চির প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের এমন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পথ চলা পুরো জেলাজুড়ে ব্যাপক কৌতূহল ও প্রশংসার জন্ম দিয়েছে।

আজ শুক্রবার (৫ জুন) বিকেলে শহরের ঐতিহ্যবাহী আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠ থেকে এই বর্ণিল র‌্যালিটি শুরু হয়। দুই দলের জার্সি, পতাকা, প্ল্যাকার্ড আর ঢাকঢোলের শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

শোভাযাত্রাটি আলতাফুন্নেছা মাঠ থেকে বের হয়ে শহরের প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা নবাববাড়ি সড়ক এবং হৃদপিণ্ড খ্যাত সাতমাথাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এ সময় রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষ করতালি দিয়ে সমর্থকদের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগকে স্বাগত জানান। পুরো শহর ঘুরে র‌্যালিটি আবারও শুরুর স্থানে এসে শেষ হয়।

ফুটবলের এই মেলবন্ধনের পাশাপাশি সমাজ সচেতনতার এক দারুণ দৃষ্টান্তও দেখা গেছে এই আয়োজনে। শোভাযাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনার আগে, ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে আলতাফুন্নেছা মাঠ প্রাঙ্গণে এক বিশেষ যৌথ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করেন ক্রীড়ামোদীরা। জলবায়ু পরিবর্তন রোধ ও পরিবেশ রক্ষার সামাজিক বার্তা দিয়েই মূলত শুরু হয় এই সম্প্রীতির যাত্রা, যা দআয়োজনের গুরুত্বকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

ব্যতিক্রমী এই আয়োজনের পেছনের মূলদর্শন জানিয়ে আর্জেন্টিনা সমর্থক অরুপ রতন ও ব্রাজিল সমর্থক পরিমল প্রসাদ রাজ বলেন, ভার্চুয়াল জগতে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থকদের কাদা-ছোড়াছুড়ি ও অন্ধ আবেগ অনেক সময় সুস্থ বিনোদনের সীমা ছাড়িয়ে যায়।

কিন্তু দিনশেষে বাস্তব জীবনে সামাজিক সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক ভালোবাসাই আসল। খেলাধুলার মূল উদ্দেশ্য যে স্রেফ নির্মল আনন্দ এবং সুস্থ প্রতিযোগিতা, কোনো ধরনের ব্যক্তিগত বিদ্বেষ বা শত্রুতা নয় সেই ইতিবাচক বার্তাই তারা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন।

আর্জেন্টিনা সমর্থক ও আকবরিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান হাসান আলী আলাল বলেন, ফুটবল মানুষের আবেগ ও আনন্দের জায়গা। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থকদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু সেটি কখনো বিভেদ সৃষ্টি করবে না। আমরা চাই খেলাকে কেন্দ্র করে বন্ধুত্ব, সম্প্রীতি ও ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে পড়ুক।

অন্যদিকে, ফুটবল যে সমাজকে বিভক্ত করে না, বরং ঐক্যের বড় প্রতীক হতে পারে, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে আরেক সমর্থক আব্দুল আওয়াল জানান, এই ধরনের উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখা জরুরি। বগুড়ার এই আয়োজনটি দেশের অন্য জেলাগুলোর সমর্থকদের জন্যও একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এবং আগামীতেও এমন সম্প্রীতি বজায় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

এই ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন শোভাযাত্রায় দুই দলের সাধারণ সমর্থকদের পাশাপাশি সংহতি জানাতে অংশ নেন স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গন ও সুধী সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। উপস্থিত ছিলেন আব্দুস সালাম বাবু, মেহেরুল সুজন, মাহবুব আলম জিয়ন, প্রতীক ওমর, শেখর রায়, সজল শেখ, শিশির মুস্তাফিজ, ববিন রহমান, তুহিন, অলোক পাল এবং সোবহানী বাপ্পীসহ আরও অনেকে। স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীদের মতে, এমন আয়োজন ফুটবল উন্মাদনাকে আরও সুন্দর ও মার্জিত রূপ দেবে।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/171427