কৃষিশ্রমে এগিয়ে থাকলেও সিদ্ধান্তে ও নীতিতে অদৃশ্য নারীর অবদান

কৃষিশ্রমে এগিয়ে থাকলেও সিদ্ধান্তে ও নীতিতে অদৃশ্য নারীর অবদান

নিজের আলোয় ডেস্ক: মাঠের হাড়ভাঙা খাটুনিতে গ্রামীণ নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের চেয়ে বেশি হলেও জমির মালিকানা, কৃষক হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, সরকারি সহায়তা কাঠামো এবং নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের উপস্থিতি এখনো চরমভাবে সীমিত। কৃষি অর্থনীতি মূলত নারীদের শ্রমের ওপর ভর করে টিকে থাকলেও কাগজে-কলমে তাদের পরিচয় যেন কেবলই একজন ‘গৃহিণী’। ভোলার বোরহানউদ্দিনে প্রায় ৪০ হাজার কৃষক আছেন, যার মধ্যে নারী কৃষকের সংখ্যা আনুমানিক চার হাজার। উপজেলার দেউলা শিবপুর গ্রামের শাহনাজ বেগমের জীবন সংগ্রামের গল্পটি অন্যদের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। ২০১৬ সালে স্বামী হারানো শাহনাজ দুই সন্তান নিয়ে চরম অভাবের মুখে পড়েন। বাবার সামান্য জমি এবং অন্যের কাছ থেকে বর্গা নেওয়া জমিতে তিনি মিষ্টি আলু, মরিচ, বাদাম ও ডালসহ বিভিন্ন ফসল ফলান।

তবে তার জীবনে ইতিবাচক বদল আসে যখন তিনি ‘কমিউনিটিভিত্তিক জলবায়ু সহনশীলতা ও নারীর ক্ষমতায়ন কর্মসূচি’ বা সিআরইএ প্রকল্পের সংস্পর্শে আসেন। সেখান থেকে আধুনিক কৃষি ও পশুপালনের প্রশিক্ষণ নিয়ে এবং উপজেলা কৃষি অফিস থেকে বীজ ও সারের সরকারি সহায়তা পেয়ে তিনি এখন স্বাবলম্বী। কিন্তু তার মতোই একই এলাকার সাচড়া ও গঙ্গাপুর ইউনিয়নের নার্গিসের মতো হাজারো নারী কৃষক কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ বা সহযোগিতা পান না। মাঠের কাজ শেষে নার্গিসকে রান্না, সন্তান লালন-পালন ও গৃহস্থালির সব কাজ একাই সামলাতে হয়। এই বিশাল শ্রমের জন্য কোনো মজুরি পাওয়ার কথা তিনি ভাবতেও পারেন না। ঋণ বা সরকারি প্রণোদনা না পাওয়ায় নার্গিসদের মতো প্রান্তিক নারীদের চড়া সুদে দাদনদার বা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধারদেনা করে চাষাবাদ চালাতে হয়। বোরহানউদ্দিন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা গোবিন্দ মন্ডল জানান, চলতি অর্থবছরে অন্তত ৫০০জন নারীকে সরকারিভাবে কৃষি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠের মূল সংকট মূলত পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও কাঠামোগত নিয়মের বেড়াজালে আটকে আছে।

এ অঞ্চলে নারীদের জমির মালিকানা দেওয়া হয় না। আর জমির কাগজে নাম না থাকলে কৃষি সহায়তা, ব্যাংক ঋণ কিংবা আনুষ্ঠানিক কৃষক পরিচয়ে প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। শাহিনা বেগমের মতো অনেক নারী কৃষক কেবল নিজের নামে জমি না থাকার কারণে ব্যাংক থেকে কোনো ধরনের ঋণ সুবিধা পাননি। গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থার প্রজেক্ট অফিসার ইরিন ইশরাত জানান, উপকূলীয় অঞ্চলের পুরুষদের একটি বড় অংশ নদীতে মাছ ধরার কাজে ব্যস্ত থাকেন। ফলে বাড়ির আশপাশের আঙিনায় সবজি চাষ, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন, পুকুরের মাছ চাষ এবং ফসল তোলার পরবর্তী প্রক্রিয়াজাতকরণের মূল কাজগুলো নারীরাই করেন। অথচ ভূমির মালিকানা সংক্রান্ত ডকুমেন্ট জটিলতার কারণে তারা সবসময় প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সহায়তার বাইরে থেকে যান।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের অধিকার ও সুশাসন কর্মসূচির পরিচালক বনশ্রী মিত্র নিয়োগী মনে করেন, নারী কৃষকদের এই অদৃশ্য থেকে যাওয়ার পেছনে গভীর কাঠামোগত ও নীতিগত সমস্যা রয়েছে। গ্রামীণ নারীরা গোয়ালঘর পরিষ্কার, পশুপালন, ধান শুকানো, মাড়াই ও বীজ সংরক্ষণের মতো কৃষির অন্যতম প্রধান কাজগুলো করলেও সমাজ ও রাষ্ট্র সেগুলোকে উৎপাদনশীল শ্রম হিসেবে না দেখে কেবল ‘ঘরের কাজ’ হিসেবে গণ্য করে। আমাদের জাতীয় কৃষিনীতি ও কৃষক পরিচয় এখনো জমির মালিকানার সঙ্গে যুক্ত থাকায় নারীর শ্রম অর্থনৈতিক মূল্যায়নে যুক্ত হয় না। এর বাইরে উপকূলের নারী কৃষকদের জন্য আরেকটি বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে জলবায়ু সংকট। জোয়ারের অস্বাভাবিক পানি আর আগাম বন্যায় প্রায়ই বিবি রহিমজানদের মতো কৃষকদের বাদাম ও সবজিক্ষেত তলিয়ে যায়। ফসল নষ্ট হলে পরিবারের খাদ্যসংস্থান, ঋণের বোঝা এবং হাঁস-মুরগির খাবার জোগানোর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি হয় নারীদের ওপর। ঝুঁকি শুধু ফসলের নয়, স্বাস্থ্যেরও। জমিতে জোয়ারের লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ায় দীর্ঘ সময় সেই নোংরা পানিতে দাঁড়িয়ে নারীদের কাজ করতে হয়। তীব্র মিঠা পানির সংকটের কারণে অনেক পরিবারকে পুকুরের নোনা পানিতেই রান্না ও গৃহস্থালির কাজ সারতে হয়, যার ফলে উপকূলের নারী কৃষকরা চর্মরোগসহ মারাত্মক জরায়ু ও মাসিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভুগছেন। এই সংকটের মুখে নারীরা এখন মাটির ঘর ছেড়ে উঁচু মাচায় ছাগল পালন এবং বস্তায় আদা চাষের মতো জলবায়ু অভিযোজন প্রযুক্তি বেছে নিচ্ছেন।

যুঁথি নারী দলের সভাপতি ফাতেমা বেগম বস্তায় আদা চাষ করে সফল হলেও তার নিজের কোনো কৃষক কার্ড নেই। তার স্পষ্ট দাবি, সরকার যেন তাকে কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, কারণ বস্তায় চাষ করলেও তিনি একজন প্রকৃত কৃষক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউএন উইমেনের ‘অবৈতনিক গৃহস্থালি উৎপাদন স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্টিং-২০২৩’ অনুযায়ী, দেশের জিডিপির ২১ থেকে ৩০ শতাংশের সমান মূল্য তৈরি হয় নারীদের অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজ থেকে। অথচ এই বিশাল অবদানের পরও পরিসংখ্যানের খাতায় কর্মবাজারে নারীর অংশ মাত্র ৩৬ শতাংশ। বিবিএসের ২০২২ সালের সময় ব্যবহার জরিপ এবং ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশের নারী ও মেয়েরা দিনে গড়ে ৫.৯ ঘণ্টা অবৈতনিক যত্নশ্রমে ব্যয় করলেও পুরুষরা করেন মাত্র ০.৮ ঘণ্টা।

কন্যা সন্তানের সুরক্ষায় যেসব কাজ করবেন
*     মেয়েকে একা কোথাও পাঠাবেন না। 
*     অভিভাবক ছাড়া পিকনিক বা বাইরে ঘুরতে যেতে দেবেন না 
*     দরজা বন্ধ ঘরে গৃহশিক্ষকের কাছে পড়তে দেবেন না 
*     কোনো অনুষ্ঠানে একা ছেড়ে দেবেন না। 
*     সন্ধ্যার পর বাইরে পাঠানো এড়িয়ে চলুন। 
*     অপরিচিত বা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে দূরে রাখুন। 
*    সোশ্যাল মিডিয়ায় অপরিচিতের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অপপবঢ়ঃ করা থেকে বিরত রাখুন। 
*     মেয়ের সাথে বন্ধুর মত কথা বলুন, তার সব কথা মন দিয়ে শুনুন। 
*     প্রয়োজনে ৯৯৯ বা নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করতে শিখিয়ে দিন। 
*     সচেতনতা ও সতর্কতাই হতে পারে আপনার কন্যা সন্তানকে নিরাপদ রাখার উপায়।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/171367