আইন সংস্কারের পাশাপাশি সচেতনতা ও যৌন শিক্ষা জরুরি: উমামা ফাতেমা

আইন সংস্কারের পাশাপাশি সচেতনতা ও যৌন শিক্ষা জরুরি: উমামা ফাতেমা

ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে শুধু আইন সংশোধন যথেষ্ট নয়; বরং পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি, যৌন শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগ ব্যবস্থাকে কার্যকর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন জুলাই অভ্যুত্থানের সংগঠক ও রাজনীতিবিদ উমামা ফাতেমা।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত “আর না ধর্ষণ, শিশু নিপীড়ন, বিচারহীনতা: কোন পথে সমাধান?” শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এ অভিমত দেন।

উমামা ফাতেমা বলেন, গত বছর মাগুরায় শিশু আছিয়ার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর দেশজুড়ে ব্যাপক জনমত ও আন্দোলন গড়ে ওঠে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ধর্ষণবিরোধী মঞ্চ গড়ে আইন সংস্কারের দাবিতে সোচ্চার হয়। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তৎকালীন ধর্ষণসংক্রান্ত আইনের বিভিন্ন অস্পষ্টতা ও দুর্বলতা তুলে ধরে সংস্কারের দাবি জানানো হয়েছিল।

 

তিনি বলেন, “তৎকালীন আইনে ব্যবহৃত অনেক টার্মিনোলজি বা পরিভাষা ছিল অস্পষ্ট এবং সেগুলোর অপব্যবহারের সুযোগ ছিল। আমরা যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ, ছেলে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা এবং সাইবার হয়রানির মতো বিষয়গুলোকে স্পষ্টভাবে আইনে সংজ্ঞায়িত করার দাবি জানিয়েছিলাম।”

উমামা জানান, এসব দাবি নিয়ে তৎকালীন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছিল এবং পরে অন্তর্বর্তী সরকার বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করে একটি সংশোধিত অধ্যাদেশ জারি করেছিল।

তবে তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের মূল সংকট শুধু আইনের ভাষা বা সংজ্ঞাগত দুর্বলতায় সীমাবদ্ধ নয়। ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা নিয়ে সামাজিক পর্যায়ে খোলামেলা আলোচনা এবং সচেতনতার অভাবও একটি বড় সমস্যা।

তিনি বলেন, “একজন শিক্ষার্থী যদি কোনো শিক্ষক বা সহপাঠীর মাধ্যমে যৌন হয়রানির শিকার হন, তাহলে কোথায় অভিযোগ করবেন, কীভাবে সহায়তা পাবেন বা কী পদক্ষেপ নেবেন, এসব বিষয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত সচেতনতা তৈরি করা হয় না।”

যৌন শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে উমামা ফাতেমা বলেন, ২০২২ সালের জাতীয় শিক্ষাক্রমে যৌন শিক্ষা সম্পর্কিত কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হলেও বাস্তবে অনেক শিক্ষক এসব অধ্যায় এড়িয়ে যান। সামাজিক ও পারিবারিক আপত্তির কারণে শিশুদের শরীর, নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষাবিষয়ক শিক্ষাও অনেক ক্ষেত্রে তাদের কাছে পৌঁছায় না।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, একসময় তিনি ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে পড়াতেন। ওই শিক্ষার্থীর মা সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন, শিশুদের এসব বিষয় কেন শেখানো হচ্ছে। একইভাবে শিক্ষার্থীও জানিয়েছিল, তাদের স্কুলে শিক্ষকরা সংশ্লিষ্ট অধ্যায়গুলো পড়ান না।

উমামা বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকেই এমন একটি সংস্কৃতির মধ্যে বড় হই, যেখানে শরীর, নিরাপত্তা বা যৌন হয়রানি নিয়ে কথা বলাকে নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে দেখা হয়। ফলে শুধু আইন পরিবর্তন করলেই বাস্তব পরিবর্তন আসবে না।”

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে গঠিত সেলগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার মতে, অধিকাংশ শিক্ষার্থীই জানেন না যে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কোনো সেল রয়েছে।

“শুধু একটি সেল গঠন করলেই হবে না। শিক্ষার্থীদের জানতে হবে কোথায় অভিযোগ করতে হবে, কী ধরনের সহায়তা পাওয়া যাবে এবং সেই সেল কীভাবে কাজ করে। অভিযোগ ব্যবস্থাকে দৃশ্যমান, সহজলভ্য ও কার্যকর করতে হবে”—বলেন তিনি।

উমামা ফাতেমা বলেন, ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে আইন সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষা, সচেতনতা, সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/171327