শজিমেকের রেডিওথেরাপি স্থায়ীভাবে বাতিল, বিপাকে উত্তরের লাখো ক্যান্সার রোগী

শজিমেকের রেডিওথেরাপি স্থায়ীভাবে বাতিল, বিপাকে উত্তরের লাখো ক্যান্সার রোগী

স্টাফ রিপোর্টার : বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের ক্যান্সার রোগীদের রেডিওথেরাপির একমাত্র লিনিয়ার এক্সিলারেটর মেশিনটি দীর্ঘ দিন বিকল থাকার পর অবশেষে স্থায়ীভাবে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে বগুড়াসহ উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলার ক্যান্সার রোগীরা স্বল্পখরচে রেডিওথেরাপি নেওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন এই অঞ্চলের দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের রোগীরা, যাদের বেসরকারি হাসপাতালে চড়া মূল্যে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য নেই। হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে এই হাসপাতালে অনকোলজি বিভাগ চালু হওয়ার পর থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত মোট ৭২ হাজার ৭৪৫ জন ক্যান্সার রোগীকে রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়েছে।

এখানে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ জন রোগী রেডিওথেরাপি পেতেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে হাসপাতালে রেকর্ডসংখ্যক রোগীকে সেবা দেওয়া হয়েছিল। ওই এক বছরেই সর্বোচ্চ ১২ হাজার ২৪৬ জন রোগী এখান থেকে রেডিওথেরাপি নেন।

এর আগেও ২০১৪ সালের শুরুতে মেশিনটি একবার বিকল হয়েছিল। ওই পুরো বছর মেশিনটি সম্পূর্ণ নষ্ট থাকায় কোনো রোগীকে রেডিওথেরাপি দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে মেরামতের পর ২০১৫ সাল থেকে পুনরায় সেবা চালু করা হয়। ২০১৫ সাল থেকে টানা সেবা দেওয়ার পর ২০২৩ সালের ১৬ আগস্ট মেশিনটি আবারও বিকল হয়ে পড়ে। এরপর বারবার চিঠি চালাচালি করেও কোনো ফল হয়নি।

শজিমেক হাসপাতালের ক্যানসার বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসা সিরাজগঞ্জের এক ষাটোর্ধ্ব ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর স্বজনের সাথে কথা বললে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি জানান, চিকিৎসকেরা তাকে দ্রুত এক মাসের রেডিওথেরাপির কোর্স দিতে বলেছেন। কিন্তু শজিমেক হাসপাতালের ক্যানসার বিভাগে এসে শুনছেন মেশিন দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ ও অচল।

বেসরকারি ক্লিনিকে থেরাপি দেওয়ার মতো টাকা বা জমিজমা তাদের আর অবশিষ্ট নেই। এখন রোগীকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে স্রেফ মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া তাদের কোনো উপায় নেই। এমন হাজারো হতভাগ্য ক্যানসার আক্রান্ত রোগীকে প্রতিদিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসপাতাল ছাড়তে হচ্ছে। বর্তমানে হাসপাতালে কেবল ক্যানসারের প্রাথমিক কেমোথেরাপি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু রেডিয়েশন বা থেরাপি বন্ধ থাকায় এই কেমোথেরাপির কার্যকারিতাও অনেকের ক্ষেত্রে মার খাচ্ছে।

হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোবাশ্বের উর রহমান জানান, প্রতিনিয়ত দেশে ক্যান্সার রোগী বাড়ছে। মূলত অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, ভেজাল খাদ্য গ্রহণ ও অসচেতনতার কারণে বিভিন্ন রকমের ক্যান্সার হচ্ছে। আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে প্রায় ৭০ ভাগ ক্যান্সার রোগীকে রেডিওথেরাপি দিতেই হয়। সরকারি হাসপাতালে একেকটি থেরাপির পুরো কোর্সে যেখানে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়, বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সেখানে লাখের বেশি টাকা ব্যয় করতে হয়।

সাধারণত ক্যান্সারের ধরন ও আকারের ওপর ভিত্তি করে রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়। প্রথম স্টেজে ৫ থেকে ৩০টি সেশনের প্রয়োজন হতে পারে। কিছু ক্যান্সারে মাত্র ৫ দিন লাগে, আবার কিছু ক্যান্সারে ২৫ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত লাগে। অন্যদিকে শেষ স্টেজে রোগীর ব্যথা কমানো, রক্তপাত বন্ধ করা বা শ্বাসকষ্ট কমানোর জন্য ৫ থেকে ১০টি থেরাপি দিতে হয়। মেশিনটি বাতিলের কারণ সম্পর্কে ডা. মোবাশ্বের উর রহমান বলেন, মেশিনটি বিকল হওয়ার পর থেকে তারা বারবার মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেছেন।

দুই দফায় এটি ঠিক করার জন্য মন্ত্রণালয় অনুমোদনও দিয়েছিল। প্রথমবার জানা গিয়েছিল এটি ঠিক করতে ৭৯ লাখ টাকা লাগবে, পরে নিমিউ অ্যান্ড টিসি জানায় এতে খরচ হবে প্রায় ৫ কোটি টাকা। তবে প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান সিমেন্স কোম্পানি জানিয়ে দেয় যে এটি ঠিক করলেও বেশি দিন ব্যবহার করা যাবে না এবং আবারও নষ্ট হয়ে যাবে। নিমিউ-এর এই টেকনিক্যাল রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় রোধে মেশিনটি চূড়ান্তভাবে বাতিল বা পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

একমাত্র মেশিনটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উত্তরবঙ্গের প্রান্তিক ক্যান্সার রোগীদের জীবন এখন চরম ঝুঁকিতে। তবে এই সংকট কাটাতে নতুন মেশিন আনার জোর প্রচেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল প্রশাসন। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মহসিন জানান, পুরোনো মেশিনটি ঠিক করলেও আর তেমন কাজ দেবে না জেনে তারা নতুন একটি আধুনিক লিনিয়ার এক্সিলারেটর মেশিনের জন্য আবেদন করেছেন।

২০২৫ সালের ১৬ জুন এই আবেদন করা হয়। কেন্দ্রীয় ঔষধাগার বা সিএমএসডি বরাবরও এ বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এখানে রেডিওথেরাপির জন্য নতুন একটি মেশিন আনার বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। খুব শীঘ্রই এই হাসপাতালে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন মেশিন আসবে বলে তারা আশা করছেন।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/170189