শহীদ জিয়া : আস্থা, ভালোবাসা এবং আত্মপ্রত্যয়ের প্রতীক
রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা তথা মানব সেবা সবকিছুই পরিচালিত হয় মানব উন্নয়নের জন্য। অনেকগুলো ফ্যাক্টরের সমন্বিত ফলাফল হলো এই মানব উন্নয়ন। পৃথিবীর সকল দেশে সুষমভাবে মানব উন্নয়ন সম্ভব হয় যখন প্রভাব সৃষ্টিকারী সকল ফ্যাক্টরের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া সম্পন্ন হয়। অর্থাৎ ফ্যাক্টরগুলোর মধ্যে পরস্পর প্যারাসাইটিক সম্পর্কের পরিবর্তে সিম্বায়োটিক সম্পর্ক বিরাজমান থাকে। আর এগুলোর সমন্বয়কারী হিসাবে অবশ্যই একজন দক্ষ পারদর্শী দিকনির্দেশকের আন্তরিক দিক নির্দেশনার প্রয়োজন হয়। এমনই একজন দক্ষ মানবপ্রেমিক দেশাত্মবোধে নিমজ্জিত একজন মহৎ প্রাণ মানব হলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। একজন সামরিক বাহিনীর মানুষ হিসেবে সাধারণ মানুষের অন্তরে জায়গা করে নেওয়া এক অকুতোভয় বীর সেনানী। যিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত একটি রাষ্ট্রের কর্ণধার হিসাবে শুধু সফলই ছিলেন না, ছিলেন একজন বিচক্ষণ ও দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক। বিশ্ব পরিমন্ডলে ছিলেন একজন মানব প্রেমিক রাজনৈতিক দিক নির্দেশক। বিপর্যস্ত অর্থনীতির একটি রাষ্ট্রে যখন দুর্ভিক্ষসহ নানা কারণে সাধারণ জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট দেখা দেয়, মানুষ আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে, নিজেদেরকে ভাগ্য হত হিসাবে ভাবতে শুরু করে এমনই একটি নাজুক পরিস্থিতিতে যিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে মানুষের মাঝে আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে এনে দেশে ও বিদেশে মানুষের কর্মের সংস্থান সৃষ্টি করেছিলেন তিনি হলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ, যে দেশে গ্রামভিত্তিক অর্থনীতি দেশের চালিকাশক্তি। তাই কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের অর্থই হলো বাংলাদেশের উন্নয়ন। আর এই উন্নয়নকে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে টেকসই করার যত রকমের আয়োজন যেমন খাল খনন, কৃষকের সহজভাবে বীজ প্রাপ্তি, কৃষি ঋণ, উন্নত ধরনের লাকসই প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষি পণ্যের গুদামজাতকরণের ব্যবস্থা, হিমাগার নির্মাণ, উৎপাদিত পণ্যের সঠিক বিপণন ও মূল্য প্রাপ্তি, কৃষক সমিতির মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যবস্থাপনা, সর্বোপরি পরিবেশ রক্ষায় সবুজ বনায়ন কর্মসূচি সবই গ্রহণ করেছিলেন বাংলার এই রাখাল রাজা। ফসল উৎপাদন দ্বিগুণ তিনগুণ করার অভিপ্রায়ে কৃষিতে গবেষণার উপর জোর দেয়া, পরিত্যক্ত হাজা মাজা পুকুর সংস্কার করে তাতে মাছ চাষ করা, রাস্তার দুপাশে ফলের গাছ লাগানো ইত্যাদির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনাই ছিল এই সফল রাষ্ট্রনায়কের কর্মস্পৃহা। এ কারণেই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এই কর্মবীর মহাপুরুষকে অন্তরের অন্তঃস্থলে জায়গা দিয়েছেন। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে এজন্য যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের শিল্পের প্রভূত উন্নয়ন করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো আরএমজি বা রেডিমেড গার্মেন্টস। এই খাতটির যথাযথ উন্নয়ন হয়েছিল জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। বাংলাদেশি রেডিমেড গার্মেন্টস বা তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নীতি ও পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সত্তরের দশকের শেষের দিকে ও আশির দশকের শুরুতে তাঁর গৃহীত বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও নীতিগত পদক্ষেপের কারণেই আজ তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাতে পরিণত হয়েছে। তাঁর গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে প্রধান দিকগুলো হলো: বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি: কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক জটিলতা দূর করতে জিয়াউর রহমানের সরকার বন্ডেড ওয়্যারহাউস এবং ব্যাক-টু-ব্যাক লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) সুবিধা চালু করে। এর ফলে উদ্যোক্তারা সহজে বিদেশি ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী কাপড় ও অন্যান্য উপকরণ আমদানি করার সুযোগ পান।
বেসরকারি খাতে উৎসাহ: স্বাধীনতার পর অর্থনীতি যখন পুরোপুরি রাষ্ট্রায়ত্ত ছিল, তখন তিনি মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু করেন। এতে বিদেশি বিনিয়োগ আসে এবং দেশীয় উদ্যোক্তারা গার্মেন্টস কারখানা স্থাপনে এগিয়ে আসেন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নারীদের অংশগ্রহণ: তাঁর শাসনামলে দেশে প্রথম রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস কারখানাগুলো যাত্রা শুরু করে। এই শিল্পে গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়, যা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে। জিয়াউর রহমান সরকার রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) গঠনের প্রাথমিক ভিত্তিও স্থাপন করেছিলেন। এসব সুবিধাজনক নীতির ধারাবাহিকতাতেই পরবর্তীতে দেশিয় প্রতিষ্ঠান যেমন দেশ গার্মেন্টস ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বিদেশি সহযোগিতায় সফলভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক দেশের অর্থনৈতিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক্ষেত্রে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ একজন রাষ্ট্রনায়ক। ধর্মের প্রতি তিনি যেমন ছিলেন অনুরক্ত ঠিক তেমনি মানবতার আতিশয্যে তিনি ছিলেন অনুপ্রাণিত। তাইতো ওআইসি, সার্ক, জি৭৭ সহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহে তাঁর নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ইসলাম ধর্মের তীর্থস্থান সৌদি আরবে প্রত্যন্ত মরুভূমিতে তিনি জেরোফাইটিক প্ল্যান্ট নিম গাছ লাগিয়ে যেমনভাবে নন্দিত হয়েছেন তেমনি বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের ধর্মপ্রাণ মুসলমান যারা প্রতি বৎসর মহান হজব্রত পালন করতে আসেন তাদের হৃদয়ে ভালোবাসার স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষ হিসাবে এটা অবশ্যই আমাদের একটি অত্যন্ত গর্বের জায়গা। আমরা জানি যে কোন দেশের উন্নয়নের জন্য নারীর ভূমিকা অতুলনীয়। এই গুরুত্বপূর্ণ ভাবনাটি মাথায় রেখে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নারীর ক্ষমতায়ন করেছিলেন।
জিয়াউর রহমান প্রথমবারের মতো দেশে মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন। নারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের একক দায়িত্ব দিয়ে ১৯৭৮ সালের ১১ ডিসেম্বর মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠিত হয়। মন্ত্রণালয় শিশুদের লালন পালনের ইস্যু সমূহের দিকেও নজর দেয়। গঠিত হয় শিশুদের স্কুল বহির্ভূত বিভিন্ন কার্যক্রমে সহায়তাদানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি। নারী সমাজকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জাতীয় মহিলা সংস্থা। পরবর্তীতে শহীদ জিয়ার আমলেই মহিলা সংস্থার অধীনে মহিলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হয়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের মতো নারীদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। আর এই উপলব্ধি বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন বিধায় আজকের বাংলাদেশে সরকারের সর্বোচ্চ পদ থেকে শ্রমজীবীদের কাতারে সর্বত্র, এমনকি সমাজের সর্বস্তরে মেয়েদের নির্ভীক পদচারণা নিশ্চিত হয়েছে।
উদাহরণ স্বরূপ দেশ রক্ষায় নারী : বাংলাদেশে পুলিশ ও আনসার বাহিনীতে নারীদের প্রথমবারের মত নিয়োগ দেন শহীদ জিয়া। তিনি অনুধাবন করেছিলেন ক্রমবধমার্ন অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণে ও নারীর ক্ষমতায়নে প্রশাসনের মূল ধারাতে নারীদের অংশগ্রহণ সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আজকে সেনাবাহিনীতে নারীরা যোগ দিচ্ছে। শুধু ডাক্তার বা নার্স হিসেবে নয়, সরাসরি যোদ্ধা হিসেবে, গোলন্দাজ বা কমিউনিকেশন ইউনিটে অফিসার হচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত ১৯৮০ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া নিয়েছিলেন। ১৯৭৬ সালের ৮ মার্চ পুুলিশ বাহিনীতে নারীদের নিয়োগ শুরু হয়। বাংলাদেশের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে এটি ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
নারী নেতৃত্ব : নারী নেতৃত্ব সৃষ্টি করার জন্য এবং মহিলাদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন করার লক্ষ্যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দল গঠন করেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি সর্বপ্রথম মহিলা রাষ্ট্রদূত ও মহিলা অডিটর জেনারেল নিয়োগ করেন। জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংখ্যা ১৫ থেকে ৩০-এ উন্নীত করেন। মহিলাদের জন্য চাকুরির ক্ষেত্রে নন-গেজেটেড পদে ১৫ শতাংশ এবং গেজেটেড পদে ১০ শতাংশ কোটা নির্ধারণ করেন। শহীদ জিয়ার মন্ত্রীসভায় মহিলা মন্ত্রী ছিলেন একাধিক। নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নে আরো একটি মাইলফলক হচ্ছে বাংলাদেশের মেয়েদের ফুটবল খেলাতে আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। মূলতঃ তাঁর সময় থেকেই মেয়েদের আন্তঃস্কুল ফুটবল টুনামের্ন্ট চালু হয়।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলেই দেশে প্রথম যৌতুকবিরোধী আইন পাশ করা হয়। সমাজে নারীদের নিরাপত্তা এবং সামাজিক অবস্থান শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ১৯৮০ সালের ১২ই ডিসেম্বর দেশে যৌতুকবিরোধী আইন পাশ করা হয়।
তিনি গ্রাম সরকার গঠন করেছিলেন সাধারণ মানুষের সেবাকে সহজলভ্য করার জন্য। প্রাইমারি হেলথ কেয়ার এর জন্য গ্রাম্য ডাক্তারদের সঠিক প্রশিক্ষণ প্রদান পূর্বক মানুষের সেবার ব্যবস্থা করেছিলেন। যুবশক্তির উন্নয়নের জন্য যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয় স্থাপন করেছিলেন যা পরবর্তীতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে রূপান্তর করা হয়। অর্থাৎ দেশের প্রকৃত উন্নয়ন এবং সেবাকে নিশ্চিত করার জন্য যতগুলো কর্মসূচি এবং পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন তার সবটুকুই জিয়াউর রহমান সরকারের ছিল। তাইতো তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে পেরেছিলেন। ক্ষণজন্মা এই মহৎ প্রান মানুষটি মানুষের অন্তরের গভীরে কতটা জায়গা করে নিয়েছিলেন তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল তার জানাযায়। বাংলাদেশী জাতীয়তা বোধের প্রবক্তা এই মহাপুরুষ মাত্র কয়েকজন বিপথগামী আর্মি অফিসারের অপ্রত্যাশিত বুলেটের আঘাতে জর্জরিত হয়ে শারীরিকভাবে বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে বিদায় নিলেও চির অমরত্ব লাভ করেন প্রতিটি বাংলাদেশীর হৃদয়ে। এজন্যই তার সুযোগ্য উত্তরসূরী আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ হৃদয়ে ঠাঁই পেয়েছেন। একইভাবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানকে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ ভালোবেসে প্রধানমন্ত্রীর আসনে আসীন করেছেন এবং তাদের প্রত্যাশিত ফলাফল পেতে শুরু করেছে। তাইতো ৩০মে আমাদের শিক্ষা দেয় ব্যক্তি জিয়াউর রহমান এর শাহাদাত বরণ হলেও আদর্শের কোন মৃত্যু নেই। আদর্শ প্রবাহিত হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। সুতরাং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বেঁচে আছেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের গভীর আস্থা, অকৃত্রিম ভালবাসায এবং অদম্য আত্মপ্রত্যয়ের প্রতীক হয়ে।
লেখক :
অধ্যাপক ড. মো: গোলাম ছারোয়ার
শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/170129