হাতে হাতে সিনেমার যুগে মানুষকে হলমুখী করা দুঃসাহসিক কাজ : বগুড়ায় ‘মুখোশ মুখো’র প্রদর্শনীতে বক্তারা
স্টাফ রিপোর্টার: বহুল আলোচিত ২০১৮ সালের একটি সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মুখোশ মুখো’র কারিগরি (টেকনিক্যাল) প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ শনিবার (২৩ মে) সন্ধ্যায় বগুড়ার মাল্টিমিডিয়া সিনেপ্লেক্স ‘মধুবন’-এ উৎসবমুখর পরিবেশে এবং হলভর্তি দর্শকের উপস্থিতিতে এই বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। চলচ্চিত্রটি বড় পর্দায় দেখার জন্য বিকেল থেকেই স্থাদনীয় সংস্কৃতিকর্মী, চলচ্চিত্র অনুরাগী এবং সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
পুণ্ড্রনগর চলচ্চিত্র সংসদের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এই বিশেষ প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বগুড়া-৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য মো. মোশাররফ হোসেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বগুড়া-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মো. রেজাউল করিম বাদশা।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনের নবনিযুক্ত প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন, দৈনিক করতোয়ার সম্পাদক মোজাম্মেল হক, এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘বঙ্গ’-র হেড অব কনটেন্ট মো. আলী হায়দার। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন বগুড়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কালাম আজাদ, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রায়হান, সাবেক প্যানেল মেয়র পরিমল চন্দ্র দাস এবং স্থানীয় কাউন্সিলর এনামুল হক সুমন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সংসদ সদস্য মো. রেজাউল করিম বাদশা তাঁর বক্তব্যে বলেন:
“এক সময় শহুরে মানুষের বিনোদনের প্রধান ও অন্যতম মাধ্যমই ছিল সিনেমা হলে গিয়ে চলচ্চিত্র উপভোগ করা। সেই সময় প্রতিটি সিনেমা হলে দর্শক ধারণের জায়গা থাকত না। কিন্তু বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে গেছে। এখন প্রতিটি ঘরে ঘরে রয়েছে স্মার্ট টেলিভিশন এবং মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে গেছে অত্যাধুনিক স্মার্টফোন।
বিনোদন এখন আর নির্দিষ্ট চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। প্রযুক্তির এমন এক বৈপ্লবিক ও চ্যালেঞ্জিং সময়ে সাধারণ মানুষকে ওটিটি বা মোবাইল স্ক্রিন থেকে বের করে পুনরায় হলমুখী করা সত্যিই একটি দুঃসাহসিক কাজ। আর এই কঠিন চ্যালেঞ্জটিই অত্যন্ত সাহসের সাথে গ্রহণ করেছে বগুড়ার একদল উদ্যোমী ও সৃষ্টিশীল তরুণ।”
তিনি আরও বলেন, অতীতে বগুড়ার মাটি থেকে দেশের বহু সুনামধন্য শিল্পী, সাহিত্যিক, কালজয়ী চলচ্চিত্র প্রযোজক, নামকরা পরিচালক এবং শক্তিমান অভিনয়শিল্পী তৈরি হয়েছেন, যারা জাতীয় স্তরে অবদান রেখেছেন। বর্তমান প্রজন্মের এই প্রতিভাবান ছেলেমেয়েরাও সেই সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দেশের মূলধারার সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং চলচ্চিত্র শিল্পে অগ্রণী ও প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
উদ্বোধকের বক্তব্যে সংসদ সদস্য মো. মোশাররফ হোসেন শিক্ষার পাশাপাশি সুস্থ বিনোদনের প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, একটি মেধাভিত্তিক ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে শিক্ষার পাশাপাশি সুস্থ ধারার বিনোদন ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের আগামী প্রজন্মকে সুস্থ ও সুন্দর মানসিকতায় ফিরিয়ে আনতে এবং অপসংস্কৃতির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে ‘মুখোশ মুখো’-র মতো বাস্তবধর্মী ও সামাজিক দায়বদ্ধতাসম্পন্ন সুস্থ ধারার চলচ্চিত্রের বিকল্প নেই।
পুণ্ড্রনগর চলচ্চিত্র সংসদের সহ-সভাপতি বিধান কৃষ্ণ রায়ের সভাপতিত্বে ও অলক পালের সঞ্চালনায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন এই চলচ্চিত্রের প্রযোজক ও পরিচালক সুপিন বর্মন। ‘মুখোশ মুখো’ মূলত একটি পলিটিক্যাল ও সাইকোলজিক্যাল ড্রামা ফিকশন ঘরানার সিনেমা।
এটি ২০১৮ সালে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচিত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে নির্মাণ করা হয়েছে। রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থাপনার ভেতরের এক ভয়ানক ও নির্মম সত্যকে এই চলচ্চিত্রে সেলুলয়েডের ফিতায় অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
চলচ্চিত্রটি মূলত আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাঠানোর আগে এর কারিগরি বিষয়গুলো (সাউন্ড, কালার ও এডিটিং) বড় পর্দায় নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং স্থানীয় সাধারণ দর্শকদের গঠনমূলক সমালোচনা ও সরাসরি মতামত জানার উদ্দেশ্যেই এই বিশেষ কারিগরি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে বলে পরিচালক সুপিন বর্মন জানান।
এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো—এর প্রধান চরিত্র থেকে শুরু করে সবকটি চরিত্রের অভিনয়শিল্পী এবং নেপথ্যের কলাকুশলী সকলেই বগুড়ার স্থানীয় বাসিন্দা। পুরো সিনেমাটির দৃশ্যধারণ থেকে শুরু করে সব কাজ বগুড়াতেই সম্পন্ন হয়েছে।
অভিনয়ে: বিভান বাদল, বিধান রায়, কবীর রহমান, মশিউর রহমান, বৈশালি, রওজা, নাজনীন, সাজিয়া আফরিন, অরূপ রতন, ফয়সাল, সাজিদ, রবি, অভি, সবুজ, রথি, স্বাধীনসহ স্থানীয় একঝাঁক নাট্যকর্মী।
চিত্রগ্রহণ: আশরাফুল ইসলাম, সম্পাদনা: অংকন সরকার,সঙ্গীতায়োজন: হিমেল
এই পুরো প্রজেক্টটির বিশেষ সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছে ‘ইন্টারনাল বাংলাদেশ’ এবং ডিজিটাল পার্টনার হিসেবে যুক্ত রয়েছে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘বঙ্গ’। প্রদর্শনী শেষে আমন্ত্রিত অতিথি, চলচ্চিত্র সমালোচক এবং উপস্থিত সাধারণ দর্শকেরা এক উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে চলচ্চিত্রটির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোকপাত করেন।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/170070