কোরবানির নামে প্রতিশোধের সংস্কৃতি কতটা যৌক্তিক

কোরবানির নামে প্রতিশোধের সংস্কৃতি কতটা যৌক্তিক

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে কোরবানির পশুর নামকরণ ঘিরে এক অস্বস্তিকর প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে। কখনও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নামে, কখনও বিরোধী রাজনৈতিক নেতা নেত্রীর নামে, আবার কখনও সামাজিক বিদ্বেষের প্রতীক বানিয়ে পশুর নাম রাখা হচ্ছে। এরপর সেই পশু কোরবানি দিয়ে একধরনের প্রতীকী প্রতিশোধের উল্লাসও দেখা যায়। বিষয়টি নিছক হাস্যরস কিংবা ব্যঙ্গ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এটি সরাসরি পবিত্র কোরবানির আদর্শিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কোরবানি কোনো ঘৃণার প্রকাশ নয়। এটি কোনো শত্রুকে প্রতীকীভাবে হত্যার আয়োজনও নয়। ইসলামে কোরবানি হলো আত্মসমর্পণ,  ত্যাগ এবং ভালোবাসার সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ।  

মহান আল্লাহ পাকের আদেশে হযরত ইব্রাহিম (আ) উনার প্রাণপ্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালামকে কোরবানি করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। সেই ঘটনা ছিল আল্লাহর প্রতি নিখাদ আনুগত্যের পরীক্ষা। সেখানে বিদ্বেষ ছিল না, প্রতিহিংসা ছিল না, ছিল না কোনো প্রতীকী শত্রুতা। ছিল কেবল ভালোবাসার সর্বোচ্চ উৎসর্গ।

পরবর্তীতে মহান আল্লাহ পাক সেই স্থানে পশু কোরবানির বিধান দান করেন। সেই থেকে কোরবানি মুসলমানের জন্য আত্মশুদ্ধির প্রতীক হয়ে আছে। ইসলামী শরিয়তে কোরবানির পশু সম্মানিত। পবিত্র কুরআন শরীফে কোরবানির পশুকে আল্লাহ পাক উনার নিদর্শন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এমনকি পশুকে সামান্য কষ্ট দেওয়া, ভয় দেখানো কিংবা অমানবিক আচরণ করাও নিন্দনীয়। যে পশুকে এত মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, তাকে বিদ্বেষের প্রতীক বানানো কিভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। ইসলাম শত্রুর প্রতীক জবাই করতে শেখায় না। ইসলাম শেখায় নিজের অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ ও নফসকে কোরবানি করতে। অথচ আমরা যদি কোরবানির পশুকেই ঘৃণার প্রতীক বানাই, তাহলে ইবাদতের আত্মা কোথায় থাকে ধর্মীয় আচারকে রাজনৈতিক বিদ্রূপের মঞ্চ বানানো কেবল রুচিহীনতাই নয়, এটি আধ্যাত্মিক অবক্ষয়েরও লক্ষণ। যখন কোনো মুসলমান কোরবানির পশুর নাম এমন কারও নামে রাখে যাকে সে ঘৃণা করে, তখন মূলত সে কোরবানির দর্শনকেই বিকৃত করে। এতে একটি ভুল বার্তা প্রতিষ্ঠিত হয় যে পশুটি যেন ঘৃণার বস্তু, আর তাকে জবাই করাই যেন প্রতিশোধের বহিঃপ্রকাশ। অথচ ইসলাম শত্রু হত্যার প্রতীক শেখায় না, শেখায় নিজের নফসকে কোরবানি করতে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ধর্মীয় আচারকে রাজনৈতিক ব্যঙ্গের উপকরণে পরিণত করার এই সংস্কৃতি তরুণ সমাজে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পর্যন্ত এটি অনেকের কাছে বিনোদনের বিষয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু যখন ইবাদত হাস্যরসের উপাদানে পরিণত হয়, তখন তার আধ্যাত্মিকতা নষ্ট হয়ে যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা ভুলে যাচ্ছি  যে ইবাদত মানুষের ভেতরের অহংকার, হিংসা ও বিদ্বেষ দূর করার কথা, সেটিকেই যদি বিদ্বেষ প্রকাশের মঞ্চ বানানো হয়, তবে সেই কোরবানি আমাদের কী শিক্ষা দিল 

কোরবানি পশু জবাইয়ের নাম নয়। এটি নিজের ভেতরের অন্ধকারকে জবাই করার নাম। যদি সেই উপলব্ধি না আসে, তবে পশুর গলায় ছুরি চালালেও অন্তরের পশুত্ব অটুটই থেকে যাবে। তখন প্রশ্ন উঠবেই, আমরা কি সত্যিই কোরবানি করছি, নাকি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা পালন করছি?

 

লেখক:

ফিয়াদ নওশাদ ইয়ামিন

কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী 
কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ 

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/169650