কোরবানির হাট: আমেজের আড়ালে দুর্নীতি
পবিত্র ঈদুল-আযহা মুসলমানদের অন্যতম মহিমান্বিত ও পবিত্র ধর্মীয় উৎসব। সামর্থ্যবান মুসলমানরা এদিন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করেন, যা ত্যাগ ও আনুগত্যের প্রতীক। তাই ঈদ উপলক্ষে খুশি আর আমেজ নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় কোরবানি পশুর হাট বসে। তবে দুঃখজনকভাবে এই আনন্দময় ও পবিত্র ধর্মীয় দিবসকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের দুর্নীতি, প্রতারণা ও অনৈতিক কর্মকান্ড সংঘটিত হয়, যা কোরবানির পবিত্রতাকে অনেকাংশে নষ্ট করে দেয়। প্রতিবছর কোরবানির সময় বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী পশুর যে হাট বসে, এসব হাটে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নগর অঞ্চলের ক্রেতারা বেশি প্রতারিত হয়ে থাকেন। কারণ অনেক সময় পশুর প্রকৃত দাম সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা থাকে না। এই সুযোগে অসাধু বিক্রেতারা পশুর ন্যায্য মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দাম আদায় করেন। ফলে সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। পাশাপাশি হাট ইজারা নিয়েও চলে বড় ধরনের দুর্নীতি। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে হাজার হাজার অস্থায়ী পশুর হাটে অনেক সময় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও কুচক্রী গোষ্ঠী সিন্ডিকেট তৈরি করে এসব হাট নিয়ন্ত্রণ করে। তারা সাধারণ বিক্রেতাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অতিরিক্ত ইজারা আদায় করে থাকে। এতে ছোট খামারি ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং পরবর্তীতে সেই লোকসানের চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর। এছাড়াও কোরবানির পশু পরিবহন নিয়েও বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়ে থাকে। এক জেলা থেকে অন্য জেলায় পশু আনা-নেওয়ার সময় বিভিন্ন স্থানে অবৈধ টোল আদায় ও চাঁদাবাজি করা হয়। এর ফলে পরিবহন খরচ বেড়ে যায় এবং সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের বহন করতে হয়। এছাড়া পশুকে মোটাতাজা ও আকর্ষণীয় দেখানোর জন্য অনেক অসাধু ব্যবসায়ী ক্ষতিকর মেডিসিন, ইনজেকশন ও স্টেরয়েড ব্যবহার করে। এসব রাসায়নিক পদার্থ পশুর শরীরে প্রবেশ করানোর মাধ্যমে যেমন ক্রেতার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়, তেমনি এসব পশুর মাংস মানবস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকিস্বরূপ হয়ে ওঠে। কোরবানির হাটে আরেকটি উল্লেখযোগ্য দুর্নীতি হলো জাল নোটের ব্যবহার। কোরবানির সময় কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু চক্র জাল নোট বাজারে ছড়িয়ে দেয় এবং বিক্রেতাদের প্রতারণার শিকার করে। বিশেষ করে ছোট খামারিরা এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। বর্তমানে অনলাইন ও ডিজিটাল মাধ্যমে পশু কেনার সময়ও অনেক ক্রেতা প্রতারণার শিকার হন। কোরবানির পশু দেওয়ার নাম করে তাদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নেওয়া হয়, কিন্তু পরবর্তীতে আর পশু পাঠানো হয় না। আবার অনেক সময় যে পশুর ছবি দেখানো হয়, সেই পশু না দিয়ে দুর্বল কিংবা অসুস্থ পশু পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যা এক ধরনের সাইবার অপরাধ। কোরবানি মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই পবিত্র উৎসবকে কেন্দ্র করে সমাজে নানা ধরনের প্রতারণা, ছলনা ও দুর্নীতি হচ্ছে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এসব প্রতারণা কেবল মানুষের সাথেই নয়, বরং সেই মহান আল্লাহর সাথেও প্রতারণার শামিল, যার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে মানুষ কোরবানি করে। লোভ ও অসততার এই কর্মকান্ড কোরবানির পবিত্রতা নষ্ট করে এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। এসব দুর্নীতি রুখে দিয়ে স্বচ্ছতা ও সততার মাধ্যমে আমরা আমাদের ঈদকে আরও আনন্দময় ও কোরবানিকে আরও পবিত্র করতে পারি। এটি মুসলমানদের অন্যতম পবিত্র ধর্মীয় উৎসব। দুর্নীতির অবসান ঘটাতে পারলে এ পবিত্রতা আরও মহিমান্বিত হবে। কোরবানির মতো পবিত্র ইবাদতকে ঘিরে যদি দুর্নীতি, অতিরিক্ত দামের প্রতিযোগিতা, চাঁদাবাজি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, তবে কোরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়। তাই প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণ সবাইকে সচেতন হতে হবে, যেন কোরবানির হাটে কোনো ধরনের দুর্নীতি, ছলনা ও প্রতারণা না হয়। এসব দুর্নীতি রোধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষও এসব দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। হাটে জাল নোট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু করা এবং ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধি করার মাধ্যমেও অনেকাংশে দুর্নীতি কমানো সম্ভব। যারা প্রতারণা কিংবা দুর্নীতি করে, তাদের উপযুক্ত শাস্তির আওতায় আনতে হবে। কারণ অনেক সময় উপযুক্ত শাস্তির অভাবে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কেউ কেউ দুর্নীতি করে থাকে। তাই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর থেকে কঠোরতর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তবেই সাধারণ মানুষ এসব দুর্নীতি থেকে রক্ষা পাবে। কোরবানি হলো আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করা।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র আল-কুরআনে বলেন, “অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর এবং কোরবানি কর।” (সূরা আল-কাউসার: ২)। আরও বলেন, “আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না কোরবানির গোশত বা রক্ত, বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।” (সূরা আল-হাজ্জ: ৩৭)। কোরবানি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ত্যাগ ও আনুগত্যের এক মহান নিদর্শন। হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর আত্মত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করেই মুসলমানরা কোরবানি আদায় করে। এর মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, তাকওয়া ও আনুগত্য প্রকাশ করে এবং গরিব-দুঃখীদের মাঝে আনন্দ ছড়িয়ে দেয়। গরিব মানুষ, যারা সারা বছর ভালো-মন্দ খাবার খেতে পারে না, তারাও এই দিনে ধনীদের মতো ভালো খাবার খাওয়ার সুযোগ পায়। তাই ঈদকে আরও সুন্দর ও মহিমান্বিত করে তুলতে প্রশাসন এবং জনগণ সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে তবেই কোরবানি ঈদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হবে।
লেখক :
সাদিয়া আক্তার চৌধুরী
শিক্ষার্থী,
ইডেন মহিলা কলেজ (অর্থনীতি বিভাগ)
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/169300