পাড়ায়-পাড়ায়, বাড়ি-বাড়ি নেই বিশ্বকাপ ফুটবলের সেই চিরচেনা উন্মাদনা

পাড়ায়-পাড়ায়, বাড়ি-বাড়ি নেই বিশ্বকাপ ফুটবলের সেই চিরচেনা উন্মাদনা

স্টাফ রিপোর্টার : ক্যালেন্ডারের পাতা জানান দিচ্ছে, দরজায় কড়া নাড়ছে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মহোৎসব। আগামী ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় যৌথভাবে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ২৩তম ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল। মেক্সিকো শহরে স্বাগতিক দেশ মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ দিয়ে পর্দা উঠবে এই মহাযজ্ঞের। এবারই প্রথম রেকর্ডসংখ্যক ৪৮টি পরাশক্তি দল নিয়ে মোট ১০৪টি ম্যাচের এক দীর্ঘ রোমাঞ্চকর লড়াই দেখবে বিশ্ববাসী।

তবে ফুটবল বিশ্বকাপের এই ঐতিহাসিক আসর শুরু হতে এক মাসেরও কম সময় বাকি থাকলেও, বিশ্বকাপ নিয়ে এবার নেই সেই চিরচেনা উম্মাদনা। এলাকার মোড়ে মোড়ে চায়ের দোকানের ধোঁয়া কাপে কিংবা পাড়ার ক্লাবে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি বা ফ্রান্সসহ বিশ্বকাপের পরাশক্তিধর দেশগুলো নিয়ে উঠতি থেকে পড়তি বয়সী ফুটবল প্রেমীদের মধ্যে নেই কোন বাক-বিতন্ডা।

এবার যেন চিত্রটাই ভিন্ন। অতীতে বিশ্বকাপ শুরুর অন্ততঃ এক মাস আগে থেকেই শহর ছেড়ে প্রত্যন্ত গ্রামে ছড়িয়ে পড়ত ফুটবল জ¦র, এবার সেখানে এক অদ্ভুত নিরবতা। নেই পতাকার লড়াই, নেই জার্সি কেনার ধুম। চায়ের কাপে কিংবা রেস্তোরাঁগুলোর সান্ধ্যকালীন আড্ডাতেও ফুটবল নিয়ে সেই চিরচেনা তর্কের ঝড় উধাও। গত কয়েকদিন আগে শহরের ব্যস্ততম গালাপট্টির সন্নিকটে হোটেল পট্টি এলাকার একটি হোটেলে বসে সান্ধ্যকালীন আড্ডা দিচ্ছিলেন শহরের কয়েকজন সচেতন নাগরিক।

টেবিলে তখন ধোঁয়া ওঠা চা। সেখানে ছিলেন বিভিন্ন পেশার কয়েকজন আড্ডাপ্রেমী মানুষ। কথায় কথায় সেখানে উঠে এলো আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আক্ষেপের সুরে হানিফার নামে বেসরকারি চাকরিজীবী বলছিলেন, আগে বিশ্বকাপ আসার অন্তত দুই-তিন মাস আগে থেকেই চারদিকে এক আলাদা উম্মাদনা তৈরি হতো। বাড়ি বাড়ি বিভিন্ন দেশের ফ্ল্যাগ ঝুলানো হতো। এক বাড়িতে ভাইয়ে-ভাইয়ে বা বাবা-ছেলের মধ্যে ভিন্ন দলের সমর্থন থাকলে, সেই বাড়িতে একসাথেই উড়ত আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল বা জার্মানির পতাকা।

এবার তেমন কিছুই চোখে পড়ছে না। তার কথার সূত্র ধরে আড্ডায় অংশ নেওয়া বগুড়া এপিবিএন স্কুল ও কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক জুয়েল যোগ করলেন, ‘কম্পিটিশন (প্রতিযোগিতা) চলত কে কার চেয়ে বড় পতাকা বানাবে তা নিয়ে। অথচ এবার খেলা চলে এলো, পুরো শহরে একটা পতাকাও চোখে পড়ছে না। শুধু এই সচেতন নাগরিকদের আড্ডাতেই নয়, মাঠপর্যায়ের বাজারচিত্র ঘুরেও মিলল এর সত্যতা।

বগুড়া স্পোর্টস মার্কেটের ‘ভিআইপি খেলাঘর’র স্বত্বাধিকারী শহীদুল ইসলামের সঙ্গে কথা বললে তিনি হতাশা ব্যক্ত করে জানান, এবার ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে ব্যবসা চরম মন্দা যাচ্ছে। ক্রেতাদের কোনো সাড়াই নেই। তবে সামনে যেহেতু কোরবানি ঈদ, হয়তো ঈদের পর বাজার কিছুটা ভালো হতে পারে।

একই মার্কেটের ‘খেলাঘর’র রুহুল আমিন বলেন, এখনো পতাকা কেনাবেচা মোটেও শুরু হয়নি। জার্সিও সেভাবে বিক্রি হচ্ছে না। অথচ আগের বিশ্বকাপগুলোতে এসময় দম ফেলার ফুসরত থাকত না। সবচেয়ে হতাশাজনক চিত্র দেখা গেছে বগুড়া নিউ মার্কেটের বড় মসজিদের গলির ভেতরের দীর্ঘদিনের চেনা পতাকা তৈরির দোকানে। সেখানকার ঐতিহ্যবাহী ‘রেজা টেইলার্স’র কারিগর মকবুল হোসেন, যিনি ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ওই দোকানে পতাকা তৈরি ও বেচাকেনার কাজ করছেন।

দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, বিশ্বকাপ নিয়ে মানুষের এমন উদাসীনতা আমি জীবনে কখনো দেখিনি। বিগত বছরগুলোতে বিশ্বকাপ শুরুর অন্তত এক মাস আগে থেকে দিন-রাত পতাকা তৈরি ও বিক্রি করতে হতো। সারাদিনে এক মুহূর্তও বসে থাকার সময় পেতাম না। আর এবার অলস সময় কাটছে। আশা করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের অল্প কিছু পতাকা আগেভাগেই তৈরি করে রেখেছি, কিন্তু এখনো একটি পতাকায় হাত দেওয়ারও ক্রেতা পাইনি।

বগুড়া জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি খাজা আবু হায়াত হিরু এবারকার এই ঝিমিয়ে পড়া আমেজের পেছনে একটি বড় কারণ উল্লেখ করে বলেন, এবার বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে মানুষের উন্মাদনা না থাকার প্রধান কারণ প্রচারণার অভাব। অন্যবার বিশ্বজুড়ে যেভাবে টুর্নার্মেন্টের আগে ডামাডোল তৈরি হয়, এবার ফিফার পক্ষ থেকেও তেমন বড় কোনো প্রচারণা চোখে পড়ছে না। তাছাড়া বাংলাদেশেও এখনো এটি নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়নি। হয়তো কোরবানির ঈদের পর কিছুটা আমেজ তৈরি হতে পারে।

স্থানীয় ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনা না থাকার পেছনে আরেকটি বড় অন্ধকার মেঘ হিসেবে কাজ করছে এই উপমহাদেশে টেলিভিশন ও ডিজিটাল মাধ্যমে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখা নিয়ে তৈরি হওয়া নজিরবিহীন অনিশ্চয়তা। জানা গেছে, সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠান ‘স্প্রিংবক পিটিই লিমিটেড’ বাংলাদেশ থেকে সম্প্রচার স্বত্বের জন্য ট্যাক্সসহ প্রায় ২০০ কোটি টাকা দাবি করেছে।

এই বিপুল পরিমাণ আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে রাষ্ট্রীয় চ্যানেল বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) কিংবা দেশের কোনো বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল বা ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এখনো খেলা দেখানোর স্বত্ব কিনতে পারেনি। উপরন্তু, উত্তর আমেরিকার সঙ্গে সময়ের বিশাল ব্যবধানের কারণে বেশিরভাগ ম্যাচ বাংলাদেশ সময় গভীর রাত বা ভোরে অনুষ্ঠিত হবে, যা বাণিজ্যিক স্পন্সরশিপ ও বিজ্ঞাপন পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। কেবল বাংলাদেশই নয়, প্রতিবেশী ভারত ও চীনেও কোটি কোটি ফুটবল ভক্তদের জন্য একই ধরনের ব্রডকাস্ট ব্ল্যাকআউট বা সম্প্রচার সংকটের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

টেলিভিশনের পর্দায় খেলা দেখা যাবে কি না এই দোলাচল আর প্রচারণাহীন বিবর্ণ আবহে এবার ফুটবলপ্রেমীদের চিরাচরিত সেই রোমাঞ্চ ঢাকা পড়ে গেছে। তবে আগামী ১১ জুন যখন বিশ্বমঞ্চে মাঠের লড়াইয়ের আসল বাঁশিটি বাজবে, তখন সমস্ত বাধা পেরিয়ে ফুটবল উন্মাদনা বাঙালির ঘরে ঘরে আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/169248