চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত কার্ড উদ্যোগ
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চা শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। কিন্তু এই খাতের প্রাণ চা শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চনা ও অবহেলার শিকার। পাহাড়-টিলা ঘেরা চা বাগানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বসবাস করেও তারা এখনও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, ন্যায্য মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত সুবিধা থেকে অনেকটাই দূরে। এই বাস্তবতায় কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড বা হেলথ কার্ডের আদলে চা শ্রমিকদের জন্য একটি বিশেষ পরিচয়ভিত্তিক সুবিধা চালু করা এখন সময়োপযোগী এবং জরুরি দাবি। বর্তমান বিশ্বে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়। বাংলাদেশের চা শ্রমিকরা এই প্রান্তিকতার এক স্পষ্ট উদাহরণ। তাদের জন্য একটি সমন্বিত “চা শ্রমিক কার্ড” চালু করা গেলে তা শুধু জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক হবে না, বরং রাষ্ট্রের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকেও আরও শক্তিশালী করবে। বিএনপি সরকার অতীতে কৃষিবান্ধব বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল কৃষি উপকরণ বিতরণ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষক কার্ড’ পাইলটিং, কৃষি ঋণ মওকুফসহ বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় চা শ্রমিকদের জন্য একটি বিশেষ কার্ড চালু করা হলে তা হবে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই কার্ডের মাধ্যমে শ্রমিকরা সহজেই স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য সহায়তা, শিক্ষা উপবৃত্তি এবং অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আসতে পারবেন।
স্বাস্থ্যখাতে এই কার্ড বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। চা শ্রমিকদের মধ্যে অপুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্য সমস্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগের হার তুলনামূলক বেশি। একটি হেলথ কার্ডের মাধ্যমে তারা নির্দিষ্ট হাসপাতাল বা ক্লিনিকে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা সেবা পেতে পারেন। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে এবং কর্মক্ষমতা বাড়বে।খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। ফ্যামিলি কার্ডের মতো একটি ব্যবস্থা চালু করে চা শ্রমিক পরিবারগুলোকে স্বল্পমূল্যে খাদ্যশস্য সরবরাহ করা গেলে তাদের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে। এতে দৈনন্দিন অনিশ্চয়তা কমবে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ অপরিহার্য। চা শ্রমিকদের সন্তানদের মধ্যে স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার এখনও উদ্বেগজনক। একটি বিশেষ কার্ডের মাধ্যমে শিক্ষা উপবৃত্তি, বই ও শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহ এবং আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে নতুন প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব। এই কার্ডের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় নিশ্চিত করা। অনেক ক্ষেত্রে চা শ্রমিকরা সঠিক নিবন্ধনের অভাবে রাষ্ট্রীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হন। একটি ডিজিটাল কার্ড চালু করা হলে একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরি হবে, যা নীতি প্রণয়ন ও সঠিক সহায়তা পৌঁছে দিতে সহায়ক হবে। সিলেট অঞ্চলে চা শ্রমিক অসন্তোষ সময় সময় যে অস্থিরতার সৃষ্টি করে, তা শুধু একটি শিল্পখাত নয়, বরং আঞ্চলিক অর্থনীতিকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে। অথচ এই চা শিল্পই সিলেটের পর্যটন আকর্ষণের অন্যতম ভিত্তি এবং জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। তাই খাতটিকে টেকসই রাখতে হলে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এখানে সরকারের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে এগোতে হবে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কাঠামোগত সংস্কারে নেতৃত্ব দিতে পারে চা শ্রমিকদের একটি পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেইজ তৈরি, ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন, কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং “চা শ্রমিক কল্যাণ কার্ড” চালুর মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান। অন্যদিকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সামাজিক সুরক্ষা বলয়কে শক্তিশালী করতে পারে ভিজিএফ, ভিজিডি, বয়স্ক ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা ও প্রতিবন্ধী সহায়তাসহ বিদ্যমান কর্মসূচিতে চা শ্রমিক পরিবারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করে। পাশাপাশি শিক্ষা উপবৃত্তি, আবাসন সহায়তা ও পুষ্টি কর্মসূচি সম্প্রসারণও জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এই দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়। বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, বরং একটি সমন্বিত নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে চা শ্রমিকদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব। চা শ্রমিকদের জন্য বিশেষ কার্ড চালু দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বিএনপির মত গরিব বান্ধব দলের সরকারের আরো একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হবে।
লেখকঃ
প্রফেসর ড. সামিউল তুষার
প্রক্টর
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (সিকৃবি), সিলেট।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/168621