মায়ের প্রতি সম্মান, যত্ন ও দায়িত্ববোধ
মা খুব ছোট্ট একটি শব্দ। কিন্তু এই শব্দ পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও অর্থবহ। শব্দটির সাথে জড়িয়ে আছে ভালোবাসা,যত্ন,দায়িত্ব ও আবেগ। মা এমন একটি সম্পর্কের নাম যার গভীরতা পৃথিবীর সকল সম্পর্কের উর্ধ্বে। একটি শিশু পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সর্বপ্রথম মা ডাকটা শিখে। তাই স্বাভাবিকভাবেই পৃথিবীর সব সন্তানেরা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে তাদের মাকে। মায়েরাও তাদের সন্তানকে অসম্ভব ভালোবাসে। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন মা প্রতি তিন বা চার মিনিটে অন্তত একবার সন্তানের কথা ভাবেন। মা শুধু একটি সম্পর্কের নাম বললে ভুল হবে। মা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কারণ একজন মানুষের জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা ভাষা,শিক্ষা, নৈতিকতা, মানবিকতা এসব কিছুর সূচনা হয় মায়ের হাত ধরে। একজন মা তার সন্তানকে যেভাবে গড়ে তুলবে, সন্তান ঠিক সেভাবেই বড় হবে। এইযে আমরা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে বসবাস করি, এগুলো গড়ে ওঠার পিছনে মায়ের অবদান অনস্বীকার্য। একটি আদর্শ জাতি গঠনে সবচেয়ে গুরুদায়িত্ব পালন করে মায়েরা। যেই মায়ের এত অবদান, আমাদের সমাজে সেই মায়ের কি যথার্থ মূল্যায়ন করা হয়?
প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক জীবনে মায়ের দায়িত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আধুনিক সমাজব্যবস্থায় মায়েরা এখন শুধু ঘরের দায়িত্বই পালন করেন না,পাশাপাশি তারা বিভিন্ন পেশায় নিষ্ঠার সাথে কাজ করেন। অফিসের দায়িত্ব শেষ করে বাড়িতে পরিবারেরও দায়িত্ব সামলান মা। একজন মা একই সাথে কর্মজীবী, সংসার পরিচালনাকারী এবং অভিভাবক। মায়েরা একসাথে এতগুলো দায়িত্ব পালনের পরেও তাদের শ্রমের বড় অংশই আড়ালে থেকে যায়। তারা তাদের প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতি পান না।কর্মজীবী মায়েদের প্রতিনিয়ত পরিবার ও পেশার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে বেগ পেতে হয়। আমরা যতই নারী ক্ষমতায়নের কথা বলি না কেন, আমাদের সামাজিক কাঠামো এখনো সেইভাবে সহায়ক হয়ে ওঠেনি। নারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন সুবিধা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত হয়নি। মায়েরা প্রতিনিয়ত সামাজিক বৈষম্য ও সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে জীবন অতিবাহিত করছে। এছাড়াও বর্তমান আধুনিকতার যুগে আমাদের পারিবারিক সম্পর্কে দূরত্ব বাড়ছে। আগে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যে আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও সময় ছিল তা বর্তমানে বহুলাংশে অনুপস্থিত। যার প্রভাবে যৌথ পরিবারও আজ বিলুপ্তির পথে। এছাড়া সন্তানদের ব্যক্তি কেন্দ্রিক জীবনধারা,ভোগবাদী সংস্কৃতি ও ব্যস্ততায় পরিবারের প্রতি আবেগ হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। মায়েরা সন্তানের জন্য সারা জীবন ত্যাগ স্বীকার করলেও, জীবনের শেষ সময়ে তারা অবহেলা ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে দিন কাটান। অথচ ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত। মাকে জান্নাতের শ্রেষ্ঠ উসিলার সাথে তুলনা করা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে সন্তানেরা এটাকে কতটুকু কার্যকর করে তুলতে পেরেছে?
সন্তানরা মায়ের সঠিক দায়িত্ব পালন করলে আজ এত বৃদ্ধাশ্রম তৈরি হতো না। মা দিবসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা অনেক আবেগঘন পোস্ট দেখতে পাই। কিন্তু বাস্তবে এটা কতটুকু কার্যকর? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন পোস্ট দেওয়ার চেয়ে বাস্তব জীবনে মায়ের প্রতি সম্মান ও দায়িত্ব নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। মা, দের শেষ জীবনের ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম না হয়ে তাদের ভালবাসার সন্তানদের নিকট হোক। জীবনের শেষ সময়ে নিঃসঙ্গতা ও অবহেলা নয় বরং সন্তান ও পরিবারের সাথে আনন্দ, উৎসবমুখর সময় কাটুক। মায়ের প্রতি ভালোবাসা শুধু একটি দিবস কেন্দ্রিক সীমাবদ্ধ না রেখে, প্রতিটি দিন মায়ের প্রতি সম্মান, যত্ন ও দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করতে হবে। তবেই একটি সুস্থ ও মানবিক সমাজ গড়ে উঠবে।
লেখক
তানভীর রহমান
শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ঢাকা কলেজ
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/168352