মা দিবসে হাহাকার : তিলে তিলে গড়া সংসারে ঠাঁই মেলেনি যে মায়েদের
স্টাফ রিপোর্টার : দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ, নির্ঘুম রাত কাটিয়ে সন্তানকে বড় করা এবং তিল তিল করে একটি সাজানো সংসার গড়ে তোলা একজন মায়ের জীবনের পুরোটা গল্পই আবর্তিত হয় সন্তানকে ঘিরে। কিন্তু জীবনের গোধূলি বেলায় এসে সেই সন্তানদের আলিশান অট্টালিকায় যখন মায়ের জন্য কয়েক ফুট জায়গার সংকুলান হয় না, তখন তাদের শেষ গন্তব্য হয় বৃদ্ধাশ্রমে। যেখানে নেই সন্তানের কোলাহল, নেই নাতি-নাতনির দুষ্টুমি, আছে শুধু স্মৃতির ডালি আর দরজার দিকে চেয়ে থাকা এক জোড়া সজল চোখ।
আজ বিশ্ব মা দিবস। মায়েদের সন্মানে একটি বিশেষ দিন পালনের এই ধারণাটি আধুনিক রূপ পায় বিংশ শতাব্দীর শুরুতে। ১৯০৮ সালে আমেরিকার আনা জার্ভিস তার মায়ের স্মৃতি রক্ষার্থে প্রথম এই দিবসের সূচনা করেন, যা পরবর্তীতে ১৯১৪ সালে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়। প্রাচীন গ্রিস বা রোমে দেবতাদের মায়েদের পূজা করার যে চল ছিল, আধুনিক যুগে এসে তা রূপ নিয়েছে প্রতিটি মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আনুষ্ঠানিকতায়। মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে সারা বিশ্ব এখন বেছে নিয়েছে মাতৃত্বের বন্দনায়। কিন্তু যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আর শহরের রেস্তোরাঁগুলো এই বন্দনায় মুখর থাকবে, তখন দেশের বিভিন্ন বৃদ্ধাশ্রমে জানালার গ্রিল ধরে ঝাপসা চোখে পথ চেয়ে থাকবেন শত শত ‘আবেদা’ কিংবা ‘জোহরা’ বেগম।
বগুড়ার টিএমএসএস মাসুদা প্রবীণ নিবাসে থাকা সত্তরোর্ধ্ব আবেদা বেগমের (ছদ্ম নাম) গল্পটি এখন আর একক কোনো ঘটনা নয়, বরং সারাদেশের এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার প্রতিফলন। স্বচ্ছল পরিবার এবং প্রতিষ্ঠিত সন্তান থাকা সত্ত্বেও গত ছয় বছর ধরে তার ঠিকানা এক চিলতে আশ্রমের কক্ষ। নাতি-পুতিদের টানে মাঝে মাঝে বাড়ি গেলেও ছেলের বউয়ের অবহেলা আর দুর্ব্যবহার তাকে একদিনের বেশি থাকতে দেয় না। অন্যদিকে ময়মনসিংহের জোহরা বেগমের গল্পটিও সমান হাহাকারের। বিশাল পারিবারিক ব্যবসা আর প্রবাসী সন্তান থাকা সত্ত্বেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এই মায়ের খোঁজ নেওয়ার সময় নেই কারো। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে গেলেই দেখা যায় এমন শত শত ‘বোঝা’ হয়ে যাওয়া মায়েদের। গাবতলীর লিলি বেগম কিংবা রাহেমুন (ছদ্ম নাম) বেগমদের মতো মায়েরা যখন ভেজা চোখে বলেন, ‘বয়স হলে মা-বাবা সংসারের বোঝা হয়ে যায়,’ তখন তা আধুনিক সভ্যতার অমানবিকতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। কারো ছেলে ওষুধ কোম্পানির বড় কর্মকর্তা, কারো ছেলে বিদেশে বিভুঁইয়ে প্রতিষ্ঠিত, অথচ মায়ের ঠাঁই হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমের চার দেয়ালে। নাতি-পুতিদের কথা বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়া এই মায়েদের চোখের জল যেন কোনো উৎসবেই শুকায় না। এখানকার মায়েরা একে অপরের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেন ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে বিকেলের ম্লান আলোয় যখন কেউ দেখা করতে আসে না, তখন শূন্যতা যেন আরও ঘনীভূত হয়।
দেশে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারের সংস্কৃতি বাড়ার সাথে সাথে প্রবীণদের একাকীত্ব ও নিরাপত্তাহীনতা প্রকট হচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি কিংবা ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতার দোহাই দিয়ে অনেক সন্তানই এখন মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিচ্ছে। অথচ সরকারি-বেসরকারি যে অল্প সংখ্যক বৃদ্ধাশ্রম রয়েছে, সেখানেও মমতার চেয়ে নিঃসঙ্গতাই বেশি সঙ্গী হয় তাদের। আনা জার্ভিস চেয়েছিলেন এই দিনটি হবে মায়ের প্রতি হৃদয়ের গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশের, কিন্তু বাণিজ্যিকিকরণের ভিড়ে আজ সেই আবেগের জায়গা দখল করেছে কেবল আনুষ্ঠানিকতা।
মা দিবস মানে কি কেবল বছরে একদিন ফুল দেওয়া কিংবা কেক কাটা? নাকি মায়ের শেষ বয়সে তার পাশে থেকে তাকে মর্যাদাপূর্ণ জীবন দেওয়া? বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিটি কক্ষ থেকে আসা দীর্ঘশ্বাস আমাদের সমাজ ব্যবস্থাকে আজ বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। যে মায়েরা সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করতে নিজের সর্বস্ব বিসর্জন দিয়েছেন, জীবনের অন্তিম সময়ে এসে তাদের বিসর্জন দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। আজকের মা দিবস হোক গভীর অনুশোচনা আর নতুন অঙ্গীকারের আর কোনো মায়ের চোখের জল যেন বৃদ্ধাশ্রমের বালিশ ভেজাতে না হয়। সন্তানরা ফিরুক মায়ের কাছে, আর মায়েরা ফিরে পাক তাদের হারানো ঘর ও অধিকার।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/168303