বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে মিড-ডে মিলে বদলে যাচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা
স্টাফ রিপোর্টার : স্কুল মানেই এখন আর শুধু বই-খাতার চাপ নয়, বরং এক বেলা পুষ্টিকর খাবারের নিশ্চয়তা। চরাঞ্চলবেষ্টিত বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার ১৬৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে সরকারি ‘স্কুল ফিডিং’ বা মিড-ডে মিল কর্মসূচি। গত বছরের ১৭ নভেম্বর এই যাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকে পাল্টে গেছে শ্রেণিকক্ষের চিরচেনা দৃশ্যপট। যেখানে আগে ক্ষুধার্ত পেটে অনেক শিক্ষার্থী মাঝপথেই বাড়ি ফিরত, সেখানে এখন হাজিরা খাতায় উপস্থিতির হার ছুঁয়েছে প্রায় শতভাগ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই কর্মসূচির আওতায় উপজেলার ১৬৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২১ হাজার ৫৫২ শিক্ষার্থী নিয়মিত দুপুরের খাবার পাচ্ছে। প্রতিদিনের মেন্যুতে পর্যায়ক্রমে থাকছে-দুধ, পাউরুটি, সেদ্ধ ডিম, বিস্কুট ও কলা। পুষ্টিকর এই খাবারের আকর্ষণে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমার পাশাপাশি পড়াশোনায় মন বসছে কোমলমতি শিশুদের।
উপজেলার কামালপুর ইউনিয়নের কাশাহার ছানিয়া বেগম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফিরোজ উদ্দিন জানান, তার স্কুলে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ১০৬ শিক্ষার্থী রয়েছে, যাদের অধিকাংশেরই বাস হতদরিদ্র পরিবারে। তিনি বলেন, আগে স্কুলে বড়জোর ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী আসতো। কিন্তু মিড-ডে মিল চালুর পর উপস্থিতি বেড়ে ৯৫ শতাংশের বেশি হয়েছে। টিফিনের পর এখন আর কাউকে বাড়ি যাওয়ার জন্য বায়না ধরতে হয় না।
একই চিত্র দীঘলকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফজলে নূর নান্নু বলেন, খাবারের মান ও নিয়মিত সরবরাহের কারণে অভিভাবকরাও এখন সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠাতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। সপ্তাহের ৫ দিনের মধ্যে ৩ দিন শিশুদের সেদ্ধ ডিম ও দু’টি করে বনরুটি দেওয়া হয়। একদিন দুধ ও পাউরুটি আরেক দিন কলা ও বিস্কুট দেওয়া হয়। এই প্রকল্পের কারিগরি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘গাক’ এবং ‘প্রাণ’। গাক রুটি, ডিম ও কলা সরবরাহ করে, অপরদিকে প্রাণ কোম্পানি বিস্কুট ও দুধ সরবরাহ করছে।
গাক’র এই প্রকল্প সমন্বয়কারী সাজ্জাদুল হক বলেন, শিক্ষার্থীদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে মানসম্মত ও পুষ্টিকর খাবার সরবরাহকে আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি। এটি শুধু একটি খাদ্য সহায়তা নয়, বরং শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বড় ভূমিকা রাখছে।
সারিয়াকান্দি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মাহাতাবুর রহমান জানান, পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করায় চরাঞ্চলের অভিভাবকরা এখন সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহী। উপজেলায় আগে গড় উপস্থিতি ছিল ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ, সেটি এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০ থেকে ৯৬ শতাংশে। এই কর্মসূচি চরাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর মডেলে পরিণত হয়েছে।
বগুড়া জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. রেজোয়ান হোসেন বলেন, মিড-ডে মিল চালুর ফলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন ও শিশুদের শারীরিক বিকাশ নিশ্চিতে এটি একটি স্থায়ী মাইলফলক হতে যাচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট স্থানীয় শিক্ষা সচেতন মহল। পরবর্তীতে দেশের প্রতিটি স্কুলে এই কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
২০২৭ সাল পর্যন্ত প্রকল্প মেয়াদে সারা দেশের ৮টি বিভাগের ৬২টি জেলার নির্বাচিত ১৬৫টি উপজেলায় এই কার্যক্রম চলছে। এর মাধ্যমে মোট ১৯ হাজার ৪১৯টি স্কুলের প্রায় ৩১ লাখ ১৩ হাজার শিক্ষার্থী সুবিধা পাচ্ছে । সারাদেশের এই ১৬৫টি উপজেলার মধ্যে ১৫০টি সরকারি অর্থায়নে এবং বাকি ১৫টি উপজেলা বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/168013