প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বাংলা-ইংরেজি রিডিং না পারলে শিক্ষকদের বেতন বন্ধ 

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বাংলা-ইংরেজি রিডিং না পারলে শিক্ষকদের বেতন বন্ধ 

চলতি বছরের জুলাই মাসের মধ্যেই দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাংলা ও ইংরেজি সাবলীলভাবে পড়তে পারার দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সময়ের মধ্যে গণিতের যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগও ভালোভাবে রপ্ত করাতে হবে। নির্ধারিত এই সময়ের মধ্যে ছাত্র-ছাত্রীদের শতভাগ নির্ভুলভাবে পড়া ও গণিতে দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন বন্ধ করে দেয়া হবে। সম্প্রতি দেশের সব জেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে লক্ষ্য নির্ধারণ করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখাওয়াৎ হোসেন। সচিবের নির্দেশনা পেয়ে এরই মধ্যে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের চিঠি দিয়েছেন স্ব স্ব জেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা।

নির্দেশনায় শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন বাংলা ও ইংরেজি বইয়ের ৫ পৃষ্ঠা জোরে জোরে শব্দ করে পড়ানোর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি গণিতের যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ শেখানোর ওপর জোর দিতে বলা হয়েছে।প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর সূত্র জানায়, গত ২৭ এপ্রিল ও ৫ মে দেশের সব জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে ভার্চুয়ালি বৈঠক করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখাওয়াৎ হোসেন। তিনি তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা, ইংরেজি ও গণিত শিক্ষার ওপর জোর দেন।

আগামী জুন মাসের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সাবলীলভাবে বাংলা ও ইংরেজি পড়ার দক্ষতা ৯০ শতাংশ এবং জুলাই মাসে ১০০ শতাংশ অগ্রগতি নিশ্চিতের নির্দেশনা দেন।

এদিকে, সচিবের নির্দেশনা মেনে এরই মধ্যে কয়েকটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে এ লক্ষ্য অর্জনে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের চিঠি দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের এ সংক্রান্ত একটি  চিঠিতে দেখা গেছে, সচিবের নির্দেশনা বাস্তবায়নে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী জুন মাসের মধ্যে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বাংলা, চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা গণিতের চার নিয়ম (যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ইংরেজি সাবলীলভাবে পড়ার দক্ষতা ৯০ শতাংশ অর্জন করবে এবং জুলাই মাসের মধ্যে তা ১০০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণির বাংলা এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ইংরেজি পাঠ্যবই প্রতিদিন ৫ পৃষ্ঠা করে জোরে জোরে পড়াতে হবে। এছাড়া চতুর্থ শ্রেণির গণিতে নির্ধারিত পাঠের পাশাপাশি যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ শেখানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

শিক্ষকদের সতর্ক করে চিঠিতে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের (জুন-জুলাই) মধ্যে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বন্ধের নির্দেশনা রয়েছে। এ অবস্থায় প্রতিটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জনের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন এবং তা ১০ মের মধ্যে ছক আকারে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে পাঠাতে হবে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোফাজ্জল হোসেন সংবাদমাধ্যমে বলেন, ‘আমরা আজই এ চিঠি দিয়েছি, চিঠিটি সঠিক। অন্যান্য জেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারাও একই ধরনের নির্দেশনা দেবেন, কেউ কেউ ইতোমধ্যে দিয়েছেনও। এটি সচিব স্যারের নির্দেশ। আমাদের সঙ্গে দুই দফা ভার্চুয়াল বৈঠকে তিনি এ লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন।’

দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে বেতন-ভাতা বন্ধের নির্দেশনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটিও মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর থেকে আমাদের জানানো হয়েছে। আমরা শিক্ষকদের সতর্ক করেছি। শিক্ষার্থীরা পড়তে না পারলে শিক্ষকরা বেতন-ভাতা পাবেন না—এটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষই জানিয়েছে।’ 

পরীক্ষাসহ ব্যস্ত সূচি, লক্ষ্য অর্জন নিয়ে শঙ্কা 
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় মে, জুন ও জুলাই- তিনমাস সময় বেঁধে দিয়েছে। কিন্তু এ সময়ে পরীক্ষাসহ বিভিন্ন ব্যস্ততা রয়েছে। ফলে এমন সময়ে শিক্ষকদের দেয়া টার্গেট পূরণ কষ্টসাধ্য হবে বলে মনে করেন শিক্ষক নেতারা।
প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দিন মাসুদ বলেন, ‘বিদ্যালয়ে এখন প্রথম প্রান্তিক মূল্যায়ন শুরু হয়েছে। এ পরীক্ষা চলবে বেশি কিছুদিন। এরপর জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতা রয়েছে। এতে চলতি মাসে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসরণের সুযোগ নেই। এরপর আবার ঈদুল আজহার ছুটি। সবমিলিয়ে মে ও জুন মাস পরীক্ষা, প্রতিযোগিতা ও ছুটিতে কেটে যাবে। অথচ জুনের মধ্যে ৯০ শতাংশ অগ্রগতির টার্গেট দেয়া হয়েছে। আমি মনে করি, এক্ষেত্রে যৌক্তিক সময় দেয়া হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন জরিপ ও গবেষণামূলক কাজ করছেন গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রধান নির্বাহী রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আলটিমেটাম দিয়ে কাজ আদায় হয় না। তবে নির্দেশনা দেয়াটাও ইতিবাচক। এক ধরনের চাপ থাকা উচিত। শিক্ষকরা যাতে ভালোভাবে পড়ান, তা তদারকি করতে হবে। পাশাপাশি যে শিক্ষকরা শেখাবেন, তাদের ভালো প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি। প্রশিক্ষণ থাকলে সহজেই শিক্ষার্থীদের আনন্দময় পরিবেশে শেখাতে পারবেন শিক্ষকরা। কারিকুলামও যুগোপযোগী করতে হবে। পরীক্ষার চাপ কমিয়ে শেখানোর দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এ পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটবে।’

নির্দেশনার ‘ভাষা’ নিয়ে শিক্ষকদের ‘দ্বিমত’
শিক্ষার্থীরা নির্ভুল ও সাবলীলভাবে বাংলা ও ইংরেজি পাঠ্যপুস্তক পড়তে পারে না। গণিতের যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগও পারে না। তাদের প্রতিদিন শব্দ করে ৫ পৃষ্ঠা পড়াতে হবে। এসব নির্দেশনায় গণহারে শিক্ষার্থীরা পারে না বলা হয়েছে। এ ভাষার সঙ্গে দ্বিমত করেছেন প্রাথমিকের শিক্ষকরা।
রাজবাড়ীর একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বাংলা রিডিং পড়তে পারে না, এটা ঠিক নয়। হয়তো অনিয়মিত বা একেবারে পিছিয়ে পড়া দু-একজনের একটু বেধে বেধে যায়। এটিকে পড়তে পারে না বলা ঠিক হবে না। গণিতের যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ অধিকাংশ শিক্ষার্থী পারে। যেখানে তারা আটকে যায়, শিক্ষকরা সহযোগিতা করেন।’ 
শিক্ষক নেতা মোহাম্মদ শামছুদ্দিন মাসুদও একই দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলা পড়ায় খুব বেশি সমস্যা নেই। একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের স্কুলে যেখান প্রতিদিন শিশুরা ক্লাসে আসতে পারে না, সেখানে হয়তো কিছু গ্যাপ আছে। তাছাড়া সমস্যা নেই। তবে হ্যাঁ, ইংরেজিতে কিছুটা সমস্যা আছে। সেটা মাধ্যমিক স্তরেও আছে, মাদরাসাতেও আছে। কারণ ইংরেজি বিদেশি ভাষা। এটা শেখার বা শেখানোর ক্ষেত্রে ঘাটতি আছে। কিন্তু সেটা নিয়ে এভাবে বলাটা অযৌক্তিক মনে করি। তারপরও সরকারি নির্দেশনা যেহেতু, তা আমাদের মেনে চলতে হবে। আমরা আরও ভালোভাবে শেখানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবো।’
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখাওয়াৎ হোসেন সংবাদমাধ্যমে বলেন, ‘জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের বেশকিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে বাংলা-ইংরেজি রিডিং শিক্ষার্থীরা যাতে ঠিকভাবে পড়তে পারে, তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও রয়েছে। এটি করতেই হবে, না হলে বর্তমান সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।’

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/167949