উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৯টি নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৯টি নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নয়টি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

মঙ্গলবার সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর বেসিনের ৫ জেলার ৯টি নদীর ১১টি স্টেশনে পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে কুশিয়ারা নদীর পানি ২২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুনামগঞ্জ জেলার মারকুলি পয়েন্টে কুশিয়ারা নদীর পানি ২২ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে।

এ ছাড়া জগন্নাথপুরে নলজুর নদীর পানি ৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৪৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নেত্রকোনায় খালিয়াজুরিতে ধনু-বাউলাই নদীর পানি ৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১৪ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে। তবে কলমাকান্দায় সোমেশ্বরী নদীর পানি ৮ সেন্টিমিটার কমে এখনও ৪২ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে। জারিয়াজঞ্জাইলে ভুগাই-কংশ নদীর পানি ১৬ সেন্টিমিটার কমলেও বিপদসীমার ৫১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নেত্রকোনা পয়েন্টে মগরা নদীর পানি ৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে ৮৭ সেন্টিমিটার এবং আটপাড়ায় ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জে কালনি নদীর পানি ১৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২৩ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে।

অন্যদিকে সুতাং রেলব্রিজ পয়েন্টে সুতাং নদীর পানি ১৭ সেন্টিমিটার কমলেও এখনও বিপদসীমার ৬৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মৌলভীবাজারে মনু নদীর পানি সবচেয়ে বেশি ১১০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১ সেন্টিমিটার ওপরে উঠেছে।

এদিকে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে নদীগুলোর পানির সমতল ঘণ্টায় শূন্য থেকে ১ সেন্টিমিটার হারে খুব ধীরগতিতে বাড়ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ভারতের বিশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, মেঘালয় ও আসামে গত ২৪ ঘণ্টায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে কাঁদছেন হাওরের কৃষকরা : পাহাড়ি ঢল ও টানা প্রবল বর্ষণে মৌলভীবাজারের বিভিন্ন হাওরে কৃষকদের আবাদ করা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। ধার-দেনা করে ফলানো সোনার ফসল চোখের সামনেই ডুবতে দেখে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাওরপাড়ের হাজারো কৃষক।

মঙ্গলবার কৃষি বিভাগের দেয়া সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত জেলার দুই হাজার ৪৯৭ হেক্টর জমির বোরো ফসল বিনষ্ট হয়েছে। প্রকৃতির এই বিরূপ আচরণের ফলে প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার কৃষক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মওজলুস গ্রামের ষাটোর্ধ্ব কৃষক আবদুল মজিদ। গ্রামের মহাজনের কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকা ধার নিয়ে হাওরে পাঁচ কিয়ার জমিতে ধান রোপণ করেছিলেন। আশা ছিল, কম করে হলেও এবার ১২০ মণের মতো ধান পাবেন। সেই ধান বিক্রির টাকা দিয়ে মহাজনের ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি ছয় সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাবেন তিনি। কিন্তু উজানের পাহাড়ি ঢল আর অতিবৃষ্টি তার সেই স্বপ্নের আশা ধুয়ে মুছে নিয়ে গেছে। হাওরের বুকসমান পানি ভেঙে কয়েক দিনের চেষ্টায় যেটুকু ধান তুলে এনেছেন, তার খরচ দিয়ে কোনো লাভের পথ দেখছেন না তিনি। কিভাবে মহাজনের ঋণের এত টাকা পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিনমজুর এই কৃষক। শুধু আবদুল মজিদ নন; কালাইপুরা গ্রামের আকবর আলী, বিরইমাবাদ গ্রামের আবদুল কাদির এবং ঘরগাঁও গ্রামের আদ্দাছ মিয়াসহ শত শত কৃষকের এখন একই অবস্থা। মনু নদী প্রকল্পভুক্ত কাউয়াদিঘী হাওরপাড়ের এসব কৃষকের কান্না কিছুতেই থামছে না। একই চিত্র হাকালুকি, হাইল হাওর, কাঞ্জার হাওর ও বিন্নার পাড়ের কৃষকদেরও।

টানা কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি ঢুকে মৌলভীবাজারের সবকটি হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এতে নিম্নাঞ্চলের শত শত হেক্টর জমির কাঁচাপাকা বোরো ধান তলিয়ে যায়। কৃষকরা জানান, টানা সপ্তাহখানেকের বেশি সময় ধরে থাকা জলাবদ্ধতায় হাওরের বোরো ধান পুরোটাই পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এদিকে হাওরের কোনো কোনো এলাকায় কৃষক হাঁটু বা বুকসমান পানি ভেঙে এখনও কাঁচাপাকা ধান কাটার চেষ্টা করছেন। কেউ বা আবার তলিয়ে থাকা ধান কেটে দলবেঁধে নৌকায় করে হাওরপাড়ে নিয়ে আসছেন। কিন্তু বৈশাখী ঝড়বৃষ্টি আর চরম শ্রমিক সংকটে ধান কাটতে বিলম্ব হচ্ছে অনেকের।

কৃষি বিভাগের দেয়া তথ্যমতে, এ বছর জেলায় ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদের বিপরীতে দুই লাখ ৮১ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতির রুদ্ররোষে সেই লক্ষ্যমাত্রা এখন কেবলই কাগুজে হিসাব। হাওরপাড়ের মানুষের কাছে এই ঢল শুধু পাহাড়ি পানি নয়, যেন তাদের বুক চিরে বেরিয়ে আসা লোনা জলের স্রোত।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/167812