সবুজের অঙ্গীকার নাকি সংখ্যার মায়া: ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সন্ধান
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রকৃতি কেবল পটভূমি নয়—এটি এক জীবন্ত চরিত্র, এক অন্তর্লীন শক্তি, যা মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। এই ভূখণ্ডে নদী যেমন গান গায়, তেমনি বৃক্ষেরা নীরবে রচনা করে জীবনের মহাকাব্য।
কিন্তু সময়ের বিবর্তনে সেই সবুজ মহাকাব্য আজ কোথাও যেন ক্ষয়িষ্ণু, কোথাও নিঃশব্দে বিলীন। এই বাস্তবতায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের প্রতিশ্রুতি নিছক একটি রাজনৈতিক ঘোষণা নয়; এটি এক প্রতীকী আহ্বান—একটি বিপন্ন পরিবেশকে পুনর্জীবিত করার, এক ক্লান্ত প্রকৃতিকে আবারও প্রাণবন্ত করে তোলার। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই প্রতিশ্রুতি কি কেবল শব্দের অলংকার, নাকি এটি বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার প্রতিফলন?
নাকি সংখ্যার আড়ালে একটি সবুজ রাজনীতি? ২৫ কোটি—এই সংখ্যা যেমন বিশাল, তেমনি এর তাৎপর্যও বহুমাত্রিক। এটি কেবল গাছের সংখ্যা নয়; এটি এক ধরনের পরিবেশ-রাজনীতির প্রতিচ্ছবি, যেখানে উন্নয়ন ও প্রকৃতির মধ্যে একটি সুষম সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। বাংলাদেশ আজ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা, খরার প্রকোপ—সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন প্রতিনিয়ত এক অঘোষিত যুদ্ধের মুখোমুখি।
এই প্রেক্ষাপটে বৃক্ষরোপণ একটি প্রতিরোধের ভাষা, একটি নীরব বিপ্লব। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ বছরে গড়ে ২০ কেজি পর্যন্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে পারে। সেই হিসেবে ২৫ কোটি গাছ ভবিষ্যতে এক বিশাল কার্বন ভাণ্ডারে পরিণত হতে পারে—যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। কিন্তু এই সম্ভাবনা তখনই বাস্তব রূপ পাবে, যখন প্রতিটি গাছ কেবল রোপিত হবে না, বরং বেড়ে উঠবে, বেঁচে থাকবে, এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনে পরিণত হবে।
তবে বাংলাদেশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নতুন নয়। প্রতি বছরই বিভিন্ন দিবস, কর্মসূচি ও প্রকল্পের আওতায় লক্ষ লক্ষ গাছ লাগানো হয়। কিন্তু একটি অস্বস্তিকর সত্য হলো—এই গাছগুলোর একটি বড় অংশই কয়েক বছরের মধ্যে হারিয়ে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, রোপণকৃত গাছের সংখ্যা নিয়ে প্রচার হয়, কিন্তু সেগুলোর বেঁচে থাকার হার নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা হয় না। ফলে “কাগজের বন” তৈরি হয়, কিন্তু “মাটির বন” গড়ে ওঠে না। এই বাস্তবতায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ একটি বিশাল প্রশাসনিক, সামাজিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ। এটি কেবল একটি প্রকল্প নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যার সফলতা নির্ভর করে ধারাবাহিকতা, দায়িত্ববোধ ও সুশাসনের ওপর।
এখন প্রশ্ন হলো কেন বারবার ব্যর্থ হয় এধরণের সবুজ উদ্যোগ? এই ধরনের বৃহৎ কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথে কিছু কাঠামোগত ও মানসিক বাধা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান- অনেক ক্ষেত্রে কোথায় কোন গাছ লাগানো হবে, সেই বিষয়ে সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার অভাব থাকে। ফলে পরিবেশের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ গাছ রোপণ করা হয়, যা টিকে থাকতে পারে না। এদিকে গাছ লাগানোর পর তার যত্ন নেওয়ার জন্য প্রয়োজন সময়, শ্রম ও অর্থ। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই অংশটি চরমভাবে অবহেলিত থাকে। জনসম্পৃ যখন কোনো প্রকল্প জনগণের নিজের হয়ে ওঠে না, তখন তা টেকসই হয় না।
গাছ যদি “সরকারের” হয়, তবে তার প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা কম থাকে। দুর্নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে কিছু ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে বিপুল সংখ্যক গাছ লাগানোর দাবি করা হলেও বাস্তবে তার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না—এটি একটি গুরুতর সমস্যা। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, এখানে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও খরা প্রায়শই গাছের বৃদ্ধিকে ব্যাহত করে।
তাই ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে কিছু সুপরিকল্পিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী।বৈজ্ঞানিক ও অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা প্রনয়নের মাধ্যমে প্রতিটি অঞ্চলের মাটি, জলবায়ু ও পরিবেশ অনুযায়ী দেশীয় প্রজাতির গাছ নির্বাচন করতে হবে। বন বিভাগ, কৃষি বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। রক্ষণাবেক্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরী।
গাছ লাগানোই শেষ নয়—এটি কেবল শুরু। অন্তত ৩-৫ বছর ধরে প্রতিটি গাছের পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে। জনসম্পৃক্ততা ও মালিকানাবোধ সৃষ্টি করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার। স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মন্দির, সামাজিক সংগঠন—সব জায়গায় বৃক্ষরোপণকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার ডিজিটাল ম্যাপিং, জিপিএস ট্র্যাকিং ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে প্রতিটি গাছের তথ্য সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। যারা গাছ লাগাবে ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে, তাদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
পাশাপাশি গাছ কাটা বা ধ্বংসের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। একটি সবুজ রাষ্ট্রচিন্তার বাস্তবায়নে এই উদ্যোগ সফল করতে হলে একে কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং এটি হতে হবে একটি জাতীয় আন্দোলন, একটি সামাজিক চেতনার অংশ। একটি দেশ তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হয়, যখন তার উন্নয়ন প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানে ঘটে। ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ সেই সহাবস্থানের একটি প্রতীক হতে পারে—যদি তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়।
এখানে প্রয়োজন—সমন্বিত নেতৃত্ব ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের প্রতি গুরুত্বারোপ, পরিবেশ শিক্ষার প্রসার ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এই উদ্যোগকে সফল করতে পারে। একটি গাছ কেবল একটি জীব নয়; এটি একটি প্রতীক—আশার, জীবনের, ভবিষ্যতের। ২৫ কোটি গাছ মানে ২৫ কোটি আশার বীজ, ২৫ কোটি সম্ভাবনার চারা। এই প্রতিশ্রুতি সফল হলে বাংলাদেশ আবারও ফিরে পেতে পারে তার হারানো সবুজ, তার নির্মল বাতাস, তার জীববৈচিত্র্যের ঐশ্বর্য।
কিন্তু ব্যর্থ হলে এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান হয়ে থাকবে—একটি অপূর্ণ স্বপ্নের নিদর্শন। অতএব, এখন সময় কেবল গাছ লাগানোর নয়—সময় গাছ বাঁচানোর, গাছকে বড় করে তোলার, এবং সেই সঙ্গে একটি জাতির ভবিষ্যৎকে সবুজ করে তোলার। শেষ পর্যন্ত, প্রতিটি রোপিত চারা যেন হয়ে ওঠে একটি জীবন্ত কবিতা—যার প্রতিটি পাতায় লেখা থাকবে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশগত ন্যায়বিচার এবং এক সবুজ আগামী দিনের গল্প।
প্রফেসর ড. মোহাঃ হাছানাত আলী
উপাচার্য নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/167549