মে দিবস: শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকারের প্রতিচ্ছবি

মে দিবস: শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকারের প্রতিচ্ছবি

মানবসভ্যতার প্রতিটি অগ্রগতির পেছনে যে শক্তি নীরবে কাজ করে গেছে, তা হলো শ্রমিক শ্রেণি। ইট-পাথরের নগর, শিল্পকারখানার চাকা, কিংবা কৃষিজমির সবুজ ফসল সবকিছুর মূলে রয়েছে শ্রমিকের ঘাম ও পরিশ্রম। মে দিবস সেই শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক প্রতীক, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় শ্রমিক ছাড়া উন্নয়ন কেবলই এক শূন্য ধারণা। মে দিবসের পেছনে রয়েছে সংগ্রামের এক গৌরবময় ইতিহাস। একসময় শ্রমিকদের দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হতো, তাও অল্প মজুরিতে এবং অনিরাপদ পরিবেশে। এই অমানবিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন গড়ে তোলে। সেই আন্দোলনের ফলেই আসে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের স্বীকৃতি। এই দিবস তাই কেবল একটি উদযাপন নয়, বরং এটি শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের প্রতীক। তবে সময় বদলালেও বাস্তবতা পুরোপুরি বদলায়নি। আজও পৃথিবীর অনেক জায়গায়, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, শ্রমিকরা নানা বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। আমাদের দেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় শ্রমিকদের অবদান অপরিসীম হলেও, তাদের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার অনেক ক্ষেত্রেই নিশ্চিত করা যায় না। নারী ও পুরুষ উভয়েই শ্রমবাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। পুরুষ শ্রমিকরা নির্মাণ, পরিবহন, কৃষি ও শিল্পখাতে তাদের শারীরিক পরিশ্রম দিয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখছেন। অন্যদিকে নারী শ্রমিকরা তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং গৃহভিত্তিক কাজে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে নারীদের অংশগ্রহণ দেশের অর্থনীতিকে বিশ্বমঞ্চে শক্ত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।

কিন্তু এই অবদানের বিপরীতে নারীরা প্রায়ই বৈষম্যের শিকার হন। অনেক ক্ষেত্রে তারা সমান কাজের জন্য সমান মজুরি পান না, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাব থাকে, এমনকি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও তাদের অগ্রযাত্রার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মাতৃত্বকালীন সুবিধা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা কিংবা সম্মানজনক কর্মপরিবেশ এসব বিষয় এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। পুরুষ শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও চিত্রটি খুব ভিন্ন নয়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কম মজুরি, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এসব তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। অনেক সময় তারা শ্রম আইন সম্পর্কে সচেতন নন, ফলে অধিকার থাকা সত্ত্বেও তা আদায় করতে পারেন না। আবার অনেক ক্ষেত্রে আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগের অভাব দেখা যায়।

মে দিবস এলে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে নানা আলোচনা, র‌্যালি, সভা-সমাবেশ ও সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। শ্লোগানে মুখরিত হয় রাজপথ, বক্তৃতায় উঠে আসে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আমাদের সামনে বারবার ফিরে আসে এই আয়োজনগুলো কি বাস্তব পরিবর্তন আনতে সক্ষম হচ্ছে? নাকি এগুলো কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? বাস্তবতা হলো, এখনো অনেক শ্রমিক সময়মতো মজুরি পান না, অতিরিক্ত কাজের জন্য ন্যায্য পারিশ্রমিক পান না, এমনকি নিরাপদ কর্মপরিবেশও তাদের জন্য নিশ্চিত নয়। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটলে অনেক সময় যথাযথ ক্ষতিপূরণও পাওয়া যায় না। এসব বিষয় প্রমাণ করে যে, মে দিবসের মূল চেতনা শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

তবে সম্পূর্ণ হতাশ হওয়ারও সুযোগ নেই। সময়ের সাথে সাথে সচেতনতা বাড়ছে। শ্রমিক সংগঠনগুলো সক্রিয় হচ্ছে, গণমাধ্যম শ্রমিকদের সমস্যাগুলো সামনে তুলে ধরছে, এবং সরকারও বিভিন্ন নীতিমালা ও উদ্যোগ গ্রহণ করছে। আন্তর্জাতিক চাপ ও বাজার ব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণেও এখন অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রমিকবান্ধব নীতি গ্রহণে বাধ্য হচ্ছে।

প্রযুক্তির অগ্রগতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে এখন শ্রমিকদের সমস্যা দ্রুত সবার সামনে চলে আসে, যা সমাধানের পথ তৈরি করে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক দিক।

মে দিবস কেবল একটি স্মরণ দিবস নয় ,এটি একটি দায়বদ্ধতা। এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শ্রমিকদের সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, বরং এটি সমাজের প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে সকল শ্রমিকের জন্য সমান সুযোগ, ন্যায্য মজুরি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলেই আমরা সত্যিকার অর্থে মে দিবসের চেতনাকে বাস্তবায়ন করতে পারব।


লেখক :

সুরাইয়া বিনতে হাসান

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা 

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/167407