মসি থেকে কিবোর্ড: সংবাদশ্রমের নতুন আখ্যান
মে মাসের তপ্ত দুপুরে যখন শিকাগোর হে মার্কেটের রক্তঝরা ইতিহাস স্মরণে রাজপথে লাল পতাকার মিছিল নামে, তখন বাতাসের ঝাপটায় মিশে থাকে হাজারো শ্রমিকের ঘাম আর দীর্ঘশ্বাসের গল্প।
১৮৮৬ সালের সেই শ্রমিক আন্দোলন আজ বিশ্বের প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের প্রতীক। তবে সময়ের চাকায় চড়ে শ্রমের সংজ্ঞা ও হাতিয়ার বদলেছে।
এক সময় সংবাদকর্মীদের পরিচয় ছিল ‘কলম সৈনিক’ হিসেবে। আজ সেই কলম অনেকটা স্মৃতি হয়ে আলমারিতে বন্দি; তার জায়গা দখল করেছে কম্পিউটারের কিবোর্ড আর হাতের স্মার্টফোন। পহেলা মে’র এই বিশেষ দিনে আমাদের ভাবনায় থাকা প্রয়োজন সেই সব নিভৃতচারী সংবাদশ্রমিকদের কথা, যাদের কিবোর্ডের খটখট শব্দে তৈরি হয় আধুনিক জনমত। আগে বলা হতো ‘অসি অপেক্ষা মসি বড়’। তখন সাংবাদিকতা ছিল একটি সাধনা, যেখানে কলমের আঁচড়ে বিপ্লব ঘটত। কিন্তু বর্তমানের ডিজিটাল বাংলাদেশে সাংবাদিকতা এখন এক নিরবচ্ছিন্ন গতির লড়াই। এখন অনলাইন সাংবাদিকতা বা ওয়েব পোর্টালের যুগে খবরের কোনো সময় নেই। ২৪ ঘণ্টা, ৭ দিন-মুহূর্তের খবর মুহূর্তে পৌঁছে দিতে হচ্ছে পাঠকের স্ক্রিনে। এই যে দ্রুততা, এর পেছনে রয়েছে হাজারো সংবাদকর্মীর ক্লান্তিহীন আঙুলের সঞ্চালন। কিবোর্ডের প্রতিটি বাটন টেপার পেছনে লুকিয়ে থাকে একজন শ্রমিকের মেধা, শ্রম এবং সময়ের বিনিয়োগ। অথচ, এই কিবোর্ড যোদ্ধাদের শ্রমের মূল্যায়ন কতটুকু হচ্ছে, তা আজ এক বড় প্রশ্ন ?
তথ্যপ্রযুক্তির এই উৎকর্ষের যুগে সংবাদকর্মীদের চ্যালেঞ্জ বহুগুণ বেড়েছে। এখন একজন সাংবাদিককে শুধু খবর লিখলেই চলে না, তাকে একই সাথে স্মার্টফোনের কিবোর্ডে আঙুল চালিয়ে দ্রুততা বজায় রাখতে হয়, আবার তথ্যের নির্ভুলতাও নিশ্চিত করতে হয়। মাঠপর্যায়ের একজন সাংবাদিক যখন তপ্ত রোদে বা বৃষ্টির মধ্যে স্মার্টফোনের কিবোর্ডে খসখস করে টাইপ করে নিউজ ডেস্কে পাঠান, তখন সেই শ্রম কোনো কারখানার শ্রমিকের শারীরিক পরিশ্রমের চেয়ে কম নয়।
কিবোর্ডের প্রতিটি ‘ক্লিক’ আসলে একেকটি মেধার ঘাম। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যমের এই কর্মীরা প্রায়ই অবহেলিত থেকে যান। দেশের অসংখ্য অনলাইন পোর্টাল ও সংবাদমাধ্যমে কর্মরত সংবাদকর্মীদের জীবন আজ এক অনিশ্চয়তার দোলাচলে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মাসের পর মাস পারিশ্রমিক বকেয়া থাকছে। অথচ শ্রম আইন অনুযায়ী ৮ ঘণ্টা কাজের কথা থাকলেও সংবাদকর্মীদের জন্য সেই সময়সীমা এক অলিখিত নিয়মে বিলীন হয়ে গেছে। কিবোর্ড ও স্মার্টফোন আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে স্বাধীনতার স্বাদ, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে ব্যক্তিগত সময়। একজন অনলাইন সাংবাদিককে ঘুমের মাঝেও সজাগ থাকতে হয় কোনো ব্রেকিং নিউজের আশায়। এই যে মানসিক চাপ এবং নিরবচ্ছিন্ন কর্মঘণ্টা, এর কি যথাযথ আর্থিক মূল্যায়ন হচ্ছে ? ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠিত অনেক সংবাদমাধ্যমের হাউসগুলো হয়তো শ্রমের মর্যাদা দিয়ে যথাসাধ্য চেষ্টা করছে কিন্তু সামগ্রিকভাবে আমাদের দেশের সংবাদ শিল্পে কিবোর্ড চালানো এই শ্রমিকদের মজুরি কাঠামো আজও নড়বড়ে।নবম ওয়েজ বোর্ড বা অন্যান্য আইনি কাঠামো অনেক সময় ডিজিটাল মিডিয়ার কর্মীদের সুরক্ষায় অস্পষ্ট। ফলে মেধাবী তরুণরা এই পেশার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। আমাদের বুঝতে হবে, কিবোর্ডের বাটনগুলো কেবল প্লাস্টিকের টুকরো নয়; এগুলো জননিরাপত্তা, গণতন্ত্র এবং উন্নয়নের বার্তাবাহক। এই বাটন যারা সচল রাখেন, তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের ও মালিকপক্ষের নৈতিক দায়িত্ব।
পহেলা মে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শ্রমের মর্যাদা না দিলে কোনো সমাজ বা শিল্প দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। কলম থেকে কিবোর্ড—হাতিয়ার যা-ই হোক না কেন, সাংবাদিকরা মূলত মেধা-শ্রমিক। তাদের জীবনমান উন্নয়ন, নিয়মিত বেতন-ভাতা এবং কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হোক এবারের মে দিবসের অঙ্গীকার। কিবোর্ডের শব্দে যেন কেবল খবরের আর্তনাদ নয়, বরং সংবাদকর্মীর স্বস্তির নিঃশ্বাসও প্রতিধ্বনিত হয়। তবেই মে দিবসের সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যাবে এই ডিজিটাল যুগে।তথ্য আর শব্দের কারিগররা যেন অবহেলার শিকার না হন, সেই প্রত্যাশায় আগামীর কিবোর্ডগুলো হোক আরও সাহসী ও সুরক্ষিত।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/167280