কুরবানির পশুর হাটে খামারির স্বপ্ন ভাঙ্গে
বছর ঘুরে আবার এলো মুসলমানদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আযহা। কুরবানির ঈদ মানেই আনন্দ, ত্যাগ আর আত্মশুদ্ধির এক অনন্য উৎসব। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) আল্লাহ তায়ালার প্রতি আনুগত্য এবং তাঁর প্রিয় পুত্রকে কুরবানি দেওয়ার প্রস্তুতির ঘটনা থেকেই এই ঈদের সূচনা হয়। আর এ উৎসবেরই একটি বিশেষ দিক হলো কুরবানির পশু। কুরবানির ঈদ এলেই দেশের পথে প্রান্তরে যেন এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। শহর, বন্দর আর গ্রামে গ্রামে শুরু হয় কুরবানির পশু কেনাবেচার ধুম। রাস্তার মোড়ে মোড়ে গড়ে ওঠে অস্থায়ী পশুর হাট, মানুষের মাঝে থাকে আনন্দ আর থাকে ব্যস্ততা। কে কোন গরু কিনছে, কার গরু বড়, কারটা সুন্দর, এসব নিয়েই চলে নানান আলোচনা। কিন্তু এর আড়ালে যে অসংখ্য খামারির শ্রম, স্নেহ, ত্যাগ আর আশা জড়িয়ে আছে তা কি আমরা কখনো ভেবে দেখি ?
এই কুরবানির পশু আমাদের কাছে কেবল মাত্র একটা দিনের আনন্দ হলেও কিছু মানুষের কাছে এটা হলো বছরের পর বছর পরিশ্রম করার ফল। যার পেছনে রয়েছে একদল কৃষক বা খামারির নিরলস স্নেহ আর যত্ন। একটা গরু বড় করতে সময় লাগে দুই থেকে তিন বছর। এমনকি খামারি তাকে তার সন্তানের মত করে ভালোবেসে বড় করে তুলে। যেখানে খাদ্য দেওয়া থেকে শুরু করে অসুখ হলে চিকিৎসা দেওয়া এমনকি রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করেও তার দেখভাল করার যাবতীয় কাজ করে থাকে। এই দীর্ঘ সময়ের, পরিশ্রমের একমাত্র উদ্দেশ্যই হলো ঈদের হাটে গরুটি বিক্রি করে তার যেন ন্যায্য মূল্য পায়। কিন্তু বাস্তবে এর উল্টোটাই দেখা গেছে। প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায় তারা প্রতারিত হয়।
এই বিষয়ে একজন খামারি মো: আরিফ রহমান বলেন, এই গরুটারে আমি ছোট থেকে নিজের সন্তানের মতো লালন পালন করেছি। সকালে উঠে আগে ওরে খাওয়াই, পরে নিজের মুখে খাবার তুলি। রোদে পুড়ছি, বৃষ্টিতে ভিজেছি শুধু ওর পেছনে যেন কিছু একটা দাঁড় করাতে পারি। ভেবেছিলাম, ঈদে গরুটা বিক্রি করলে সেই টাকায় টিনের একটা ছাউনিওয়ালা ঘর তুলব, মেয়ে-ছেলেকে নিয়ে একটু শান্তিতে থাকব। কিন্তু হাটে গিয়ে যখন গরুটার দাম শুনলাম, তখন মনে হলো গরু না, যেন আমি নিজেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছি। লোকজন গরুর পেছনের যত্নটা দেখে না, দেখে শুধু মাংসের ওজন। কেউ ভাবে না এই গরুটার পেছনে একজন মানুষের স্বপ্ন ছিল। এখন মনে হচ্ছে, স্বপ্নটা যেন হাটেই রেখে আসলাম। এই বিষয়ে আরো একজন খামারি মোঃ লালু মন্ডল বলেন, সারা জীবন গরু পালছি। ঈদ এলেই মনে হয় এইবার ভালো দাম পাব। কিন্তু প্রতি বছরই ঠকতে ঠকতে ক্লান্ত হইয়া গেছি। এখন তো বাজারে গরুর দাম শুনলে মনে হয় গরুর দাম কম না, মানুষ গরুর চেয়ে দামী হইয়া গেছে। এ বিষয়ে আরেক খামারি মোঃ জালাল উদ্দিন বলেন, আমরা তো গরুকে মানুষ করি নিজের সন্তানের মতো। কিন্তু হাটে বিক্রি করতে গেলে মনে হয় কেউ আমাদের স্বপ্নটা কিনতে আসে নি তারা এসেছে শুধু গরুর দেহের হিসাব করতে। তারা দেখে কত কেজি মাংস হবে আর কত লাভ হবে। কিন্তু আমরা দেখি গরুর চোখে মুখে নিজের সন্তানের মুখ। তাই কম দামে বিক্রি করতে গেলে কান্না চেপে রাখতে পারি না।
খামারিরা যে শুধুমাত্র তাদের ন্যায্য মূল্য থেকেই বঞ্চিত হচ্ছে বিষয়টা তা নয় বরং হাটে দিন দিন দালাল ও অসাধু ব্যবসায়ীদের প্রকোপও বেড়েছে। বর্তমানে ঈদে পশুর হাটে দালাল ও অসাধু ব্যবসায়ীরা অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে গরু বা ছাগল ক্রয় বিক্রি করতে গেলে দালালের কাছে যেতেই হবে। ঈদুল আযহা ঘনিয়ে আসলেই পশুর হাটগুলো জমজমাট হয়ে উঠে। যার আড়ালে দালাল ও অসাধু ব্যবসায়ীদের প্রকোপও আরো বেড়ে যায়। আবার দেখা গেছে, খামারিরা হাটে যখন তাদের গরু নিয়ে আসে তখন কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা সাধারণ খামারির কাছ থেকে গরুর দাম জেনে নিয়ে পরে আরেক ক্রেতার কাছে চড়া দামে বিক্রি করার জন্য গরু কিনে নেয়। আবার কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এমনও আছে যে প্রথমে এসে গরুর নানান রকম দোষ খুঁজে বলে গরুটার দাঁত ঠিক না, ওজন কম, বয়স হয়নি, হাঁটাচলায় সমস্যা ইত্যাদি আরো দোষ বের করে একজন খামারির মনোবল ভেঙে দেয়। আবার কুরবানির পশু বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আছে যারা কৃত্রিম উপায়ে রাসায়নিক যুক্ত খাবার খাইয়ে গরুকে মোটাতাজা করে বিক্রি করে।
এই বিষয়ে রাসেল আহাম্মেদ বলেন, গরুর পেছনে দুইটা বছর খাটছি। নিজের জমি বিক্রি করে খাবার দিছি। হাটে গিয়ে দাম শুনে মনে হল এই দেশে খামারি হওয়ায় অপরাধ। আমরা ৫০% দামও পাই না। এমনকি দালালদের খপ্পরে না পড়লে গরু বিক্রি হয় না, আর পড়লে ঠকতে হয়। এক কথায় ঈদে কোরবানি হয় না, বরং খামারিরাই কোরবানি হয়। এই বিষয়ে আরেক খামারি রুস্তম শেখ বলেন, দালালরা এখন হাটের মালিক। তাদের কথা ছাড়া গরু বিক্রি হয় না। তারা প্রথমে গরুর দোষ খুঁজে খামারির মন গলায়, পরে কম দামে কিনে নিয়ে চড়া দামে বিক্রি করে। আমরা যারা গরু পালি, আমাদের পরিশ্রমের কোনো দাম নাই। হাটে গেলে মনে হয় আমরা খামারি না, আমরা হলাম বেচারা মানুষ যাদের স্বপ্ন বিক্রি হয় ঠকিয়ে।
লেখক :
সৈয়দা ফারিভা আখতার
শিক্ষার্থী, রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/166866