যাকে চেনেনই না, তার সাফল্যে কেন আপনার মন খারাপ?
ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের ফিড স্ক্রল করতে করতে অন্যের তথাকথিত ‘নিখুঁত’ জীবন দেখে হীনম্মন্যতায় ভোগা এখনকার সাধারণ চিত্র। অদ্ভুত বিষয় হলো, যাদের সাফল্যে আমরা বিচলিত হচ্ছি, তাদের বড় অংশের সঙ্গেই আমাদের ব্যক্তিগত কোনো জানাশোনা নেই। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই অস্থির অনুভূতিকে বলা হয় ‘প্যারাসোশ্যাল জেলাসি’। ডিজিটাল পর্দার চাকচিক্য কীভাবে আমাদের মনের শান্তি কেড়ে নিচ্ছে, তা এখন বড় এক ভাবনার বিষয়।
প্যারাসোশ্যাল জেলাসি বলতে বোঝায় এমন একতরফা হিংসা বা প্রতিযোগিতার অনুভূতি, যা তৈরি হয় এমন কারো প্রতি যাকে আপনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। এই ব্যক্তি হতে পারেন কোনো সেলিব্রিটি, ইনফ্লুয়েন্সার বা সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট ক্রিয়েটর। আপনি তার জীবন নিয়মিত দেখেন, তার সাফল্য পর্যবেক্ষণ করেন, আর ধীরে ধীরে নিজের জীবনকে তার সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেন। এই তুলনাই একসময় হিংসার রূপ নেয়।
মনোবিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মূলত প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপের একটি নেতিবাচক দিক। যেখানে একজন মানুষ মিডিয়ার মাধ্যমে কারো সঙ্গে একতরফা মানসিক সম্পর্ক তৈরি করে।
এটাই আধুনিক ডিজিটাল যুগের একটি মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, যাকে বলা হয় ‘প্যারাসোশ্যাল জেলাসি’। এটি এমন এক ধরনের একতরফা আবেগ, যেখানে মানুষ অনলাইনে দেখা কারো সঙ্গে মানসিকভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে এবং নিজের জীবনের সঙ্গে তার তুলনা করতে শুরু করে।
কীভাবে এই অনুভূতি তৈরি হয়
এই অনুভূতি একদিনে তৈরি হয় না। প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস ধীরে ধীরে এটিকে গড়ে তোলে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বারবার একই ধরনের কনটেন্ট দেখা, ইনফ্লুয়েন্সারদের লাইফস্টাইল ফলো করা এবং নিজের জীবনের সঙ্গে অচেতন তুলনা করাই মূল কারণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা সাধারণত মানুষের জীবনের শুধু সুন্দর ও সাজানো অংশ দেখি। কিন্তু নিজের জীবনের বাস্তবতা দেখি প্রতিদিনের চ্যালেঞ্জের সঙ্গে। এই অসম তুলনাই মানসিক চাপ তৈরি করে।
কীভাবে বুঝবেন আপনি এই ফাঁদে আছেন
কিছু লক্ষণ দেখে বোঝা যায় আপনি প্যারাসোশ্যাল জেলাসির মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন-
১. আপনি হয়তো ভাবেন শুধু সময় কাটানোর জন্য স্ক্রল করছেন। কিন্তু বাস্তবে বারবার নির্দিষ্ট একজন ইনফ্লুয়েন্সার বা কনটেন্ট ক্রিয়েটরের প্রোফাইল চেক করছেন। তার নতুন পোস্ট, স্টোরি বা আপডেট আপনার অজান্তেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
২. আপনি দেখেন তার সুন্দর মুহূর্ত, আর নিজের সাধারণ দিনগুলোর সঙ্গে তুলনা শুরু করেন। এতে মনে হতে পারে আপনার জীবন পিছিয়ে আছে বা কম সফল। এতে নিজের জীবন ধীরে ধীরে কম আকর্ষণীয় মনে হতে থাকে। এই তুলনাই ধীরে ধীরে হিংসা বা অস্বস্তি তৈরি করে।
৩. সময়ের সঙ্গে নিজের পোশাক, স্টাইল বা লক্ষ্য পরিবর্তন করতে থাকেন, শুধু কারো মতো হওয়ার জন্য। এতে নিজের আসল পরিচয় কিছুটা হারিয়ে যেতে শুরু করে।
তবে মজার বিষয় হলো আপনি এমন একজনের সঙ্গে অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় আছেন, যিনি আপনার অস্তিত্ব সম্পর্কেই জানেন না।
এই অনুভূতির মানসিক প্রভাব
প্যারাসোশ্যাল জেলাসি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে। নিজের জীবনের প্রতি অসন্তুষ্টি তৈরি হয়। নেতিবাচক চিন্তা বাড়তে থাকে। এটি ধীরে ধীরে মানসিক অস্থিরতা ও উদ্বেগের কারণও হতে পারে। অনেক সময় মানুষ এটিকে মোটিভেশন মনে করে ভুল করে। মনে হয় অন্যকে দেখে এগোচ্ছি, কিন্তু বাস্তবে এটি সবসময় ইতিবাচক হয় না। কারণ এই অনুপ্রেরণার ভিত্তি নিজের লক্ষ্য নয়, অন্যের জীবন।
এটি বিপজ্জনক হতে পারে
এর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এটি একতরফা প্রতিযোগিতা। আপনি যাকে নিয়ে ভাবছেন, সে আপনার সঙ্গে কোনো প্রতিযোগিতাতেই নেই। তবুও আপনার মনে একটি চাপ তৈরি হয়। এই চাপ ধীরে ধীরে মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে এবং বাস্তব জীবনের সম্পর্ক থেকেও দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার সীমিত করতে হবে। সারাদিন বারবার ফিড চেক করার বদলে নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন। অকারণ স্ক্রলিং কমালে তুলনা করার সুযোগও কমে যায়।
নিজের জীবনের লক্ষ্য ও অর্জনের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। নিজের ছোট সফলতাগুলোকে গুরুত্ব দিতে শিখতে হবে।
পরিবার, বন্ধু বা কাছের মানুষের সঙ্গে সময় কাটান। বাস্তব জীবনের সম্পর্ক যত শক্ত হবে, ভার্চুয়াল জগতের প্রভাব তত কমে যাবে।
মাঝে মাঝে কিছু সময়ের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বিরতি নিন। এতে মানসিক চাপ কমে এবং নিজের চিন্তা পরিষ্কার হয়।
প্যারাসোশ্যাল জেলাসি নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি হলো সচেতনতা। সোশ্যাল মিডিয়াকে অনুপ্রেরণার জায়গা বানান, তুলনার নয়। নিজের বাস্তব জীবনকে গুরুত্ব দিলে এই মানসিক চাপ ধীরে ধীরে কমে যাবে।
সূত্র: টাইমস নাউ, সাইকোলজি টুডে
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/166461