অবহেলিত ও উন্নয়ন বঞ্চিত বগুড়া
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা বগুড়া ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার জন্য সুপরিচিত। এটি উত্তরবঙ্গের একটি শিল্প ও বাণিজ্যিক শহর। বগুড়াকে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বলা হয়। এটা একটি শিল্পের শহর। এখানে ছোট ও মাঝারি ধরনের বেশকিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বগুড়া জেলা পুন্ড্রবর্ধনের রাজধানী ছিল। যা বর্তমানে মহাস্থানগড় নামে পরিচিত। ২১ টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত বগুড়া পৌরসভার বর্তমান আয়তন ৭১.৫৬ বর্গকিলোমিটার। দুঃখজনক হলেও সত্য, বিগত সরকারের দীর্ঘ প্রায় ২০ বছরে কোন দাবিই পূরণ হয়নি বগুড়াবাসীর। এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও জেলাটি আজও অবহেলিত ও উন্নয়ন বঞ্চিত অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। উন্নয়নের মূলধারায় পুরোপুরি যুক্ত হতে না পারায় এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা নানা সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ।
প্রথমত, অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে বগুড়া অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। যদিও এটি উত্তরবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেন্দ্র, তবুও সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়ন এখনো সন্তোষজনক নয়। প্রধান সড়কগুলোর অনেক জায়গায় সংকীর্ণ ও ভাঙাচোরা, ফলে যানবাহন চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি হয় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। শহরের ভেতরে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট এবং দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা একটি নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিক নগর পরিকল্পনার অভাবে শহরের পরিবেশ ও জীবনমান দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি আধুনিক নগরের জন্য “কত কিলোমিটার রাস্তা থাকা দরকার”- এর নির্দিষ্ট কোন বিধান নেই। এটি শহরের আয়তন, জনসংখ্যা ও পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে। তবে নগর পরিকল্পনায় কিছু স্বীকৃত মানদন্ড আছে। আধুনিক শহরে সাধারণত মোট ভূমির ২০% হতে ৩০% অংশ রাস্তার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। আর কিলোমিটার হিসেবে বলতে গেলে, প্রতি ১ বর্গকিমি এলাকায় আদর্শভাবে ১০-১৫ কিমি রাস্তা থাকা উচিত। হাঁটার পথ, সাইকেল লেন, ড্রেনেজ এসবও আধুনিক রাস্তার অংশ।সে হিসাবে ৭১.৫৬ বর্গকিলোমিটার বগুড়া পৌর এলাকার জন্য অন্তত ৭০০ কিলোমিটার রাস্তা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, শিল্প ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বগুড়ার অবস্থা আশানুরূপ নয়। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যেখানে শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠছে, সেখানে বগুড়ায় বড় ধরনের শিল্পায়ন হয়নি। কিছু ছোট ও মাঝারি শিল্প থাকলেও তা পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না। ফলে এখানকার তরুণ সমাজ উন্নত জীবিকার আশায় রাজধানী ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহরে চলে যেতে বাধ্য হয়। এই প্রবণতা একদিকে যেমন গ্রামীণ অর্থনীতিকে দুর্বল করে, অন্যদিকে পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করে। তৃতীয়ত, শিক্ষা খাতে কিছু অগ্রগতি থাকলেও মানসম্মত উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সীমিত। সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলেও আধুনিক গবেষণাগার, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ কম। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করতে অনেক সময় পিছিয়ে পড়ে। একইভাবে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। উন্নত চিকিৎসা সুবিধা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে অনেক রোগীকেই রাজশাহী বা ঢাকায় যেতে হয়, যা সময় ও অর্থ দুইয়েরই অপচয় ঘটায়। চতুর্থত, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও কৃষি খাতে প্রয়োজনীয় আধুনিকায়ন হয়নি। বগুড়া ধান, আলু, কলা ও বিভিন্ন সবজি উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন, কারণ পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার, হিমাগার ও বাজার ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের অভাব উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পথে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে কৃষকেরা পরিশ্রম করেও কাক্সিক্ষত মুনাফা পান না।
পঞ্চমত, তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বগুড়া পিছিয়ে রয়েছে। যদিও “ডিজিটাল বাংলাদেশ” গড়ার লক্ষ্যে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বগুড়ার গ্রামীণ এলাকাগুলোতে এখনো পর্যাপ্ত ইন্টারনেট সুবিধা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। এর ফলে শিক্ষার্থী ও তরুণরা প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়া পরিবেশগত সমস্যাও বগুড়ার উন্নয়নের পথে একটি বড় বাধা। নদী ভাঙন, জলাবদ্ধতা এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ঐতিহাসিক নদী করতোয়া আজ তার আগের রূপ হারাতে বসেছে, যা শুধু পরিবেশ নয়, কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তবে এত সীমাবদ্ধতার মাঝেও বগুড়ার সম্ভাবনা অপরিসীম। ভৌগোলিক অবস্থান, উর্বর জমি, পরিশ্রমী জনগোষ্ঠী এবং সমৃদ্ধ ইতিহাস সব মিলিয়ে এটি একটি উন্নত জেলার ভিত্তি বহন করে। যদি পরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, কৃষি আধুনিকায়ন এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা হয়, তবে খুব দ্রুতই বগুড়া উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারবে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সচেতনতা ও অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি রোধ, সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। পাশাপাশি পর্যটন খাতকে গুরুত্ব দিয়ে মহাস্থানগড়সহ অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থানের উন্নয়ন করা হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বগুড়া একটি সম্ভাবনাময় জনপদ, যা দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে তার প্রকৃত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। এখন সময় এসেছে এই উন্নয়ন বঞ্চিত জেলার দিকে নতুন করে দৃষ্টি দেওয়ার। বগুড়াবাসীর প্রাণের দাবির সংগে একাত্মতা প্রকাশ করে বলতে চাই যে, নিম্নের উন্নয়নসমূহ দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে বগুড়াকে একটি উন্নত, আধুনিক ও মডেল সিটিতে পরিণত করা সম্ভব হবে - ১। বগুড়া সিটি কর্পোরেশন ঘোষণা দ্রুত বাস্তবায়ন, ২। আইন সংশোধন করে বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় দ্রুত চালু করা, ৩। বগুড়া - সিরাজগঞ্জ রেল লাইন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নির্মাণ শেষ করা, ৪। বগুড়া বিমানবন্দর চালু করতঃ দ্রুত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীত করা, ৫। বগুড়ায় আরো একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপন, ৬। বগুড়ায় একটি ক্যাডেট কলেজ স্থাপন. ৭। বগুড়ায় একটি আধুনিক ভাষা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন, ৮। টিচার্স ট্রেনিং কলেজ স্থাপন (উল্লেখ্য যে, এ অঞ্চলের শিক্ষকদের সরকারি কোন প্রশিক্ষণের জন্য রাজশাহী বা পাবনা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে যেতে হয়।), ৯। ইকোনোমিক জোন বা ইপিজেড স্থাপন, ১০। দ্বিতীয় বিসিক শিল্প নগরী স্থাপন প্রকল্পকে বাস্তবে রূপ দেওয়া, ১১। দেশসেরা নগরবিদদের নক্সা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ শহর এলাকার সকল রাস্তা সংস্কার ও পুননির্মাণ করা, ১২। বাংলাদেশ টেলিভিশনের আঞ্চলিক কেন্দ্র স্থাপন, ১৩। বগুড়ার রিলে বেতার কেন্দ্রকে পূর্ণাঙ্গ বেতার কেন্দ্রে রূপান্তর (উল্লেখ্য যে, উক্ত বেতার কেন্দ্রটি ১৯৮৭ সালে স্থাপন করা হয়। ১৯৮৯ সালে প্রচার শুরুর পর হতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৮ বছর ধরে রাজশাহী বেতারের অনুষ্ঠান প্রচার করে আসছে।) ১৪। বগুড়ায় বিকেএসপির আঞ্চলিক কেন্দ্র স্থাপন, ১৫। বগুড়ার শহীদ চাঁন্দু ক্রিকেট স্টেডিয়ামকে সংস্কার করে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, ১৬। বগুড়ায় আলাদা করে একটি আধুনিক ফুটবল স্টেডিয়াম স্থাপন, ১৭। বিনোদনের জন্য বগুড়ায় আধুনিক সুবিধা সম্বলিত পার্ক স্থাপন, ১৮। বনানী হতে মাটিডালী পর্যন্ত উড়াল সড়ক নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণপূর্বক দ্রুত বাস্তবায়ন করা, ১৯। বগুড়ার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব ও বিজ্ঞান ল্যাব স্থাপন করা যা পূর্বের সরকার এ অঞ্চলে খুবই কম বরাদ্দ দিয়েছে, ২০। জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হতে মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল রোড ও গোহাইল রোডের সংযোগ স্থলে গোহাইল রোডের উপর ফ্লাইওভার স্থাপন, ২১। নগরবাসীর বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য ‘‘বগুড়া ওয়াসা” স্থাপন প্রকল্প গ্রহণপূর্বক দ্রুত বাস্তবায়ন করা, ২২। বঞ্চিত বগুড়াবাসীর জন্য বাসাবাড়িতে পুনরায় গ্যাস সংযোগ প্রকল্প গ্রহণ করাসহ পুরাতন সংযোগকৃত লাইনে অতিরিক্ত চুলা ব্যবহারের অনুমতি প্রদান, ২৩। বগুড়ায় অন্তত একটি বিশ্বমানের হাসপাতাল স্থাপন যা বিদেশী সহায়তায় হতে পারে, ২৪। আধুনিক বিশ্বের সংগে তাল-মিলাতে বগুড়ায় আন্তর্জাতিক মানের রোবোটিক্স ইনস্টিটিউট স্থাপন, ২৫। বগুড়ায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অধীন ড্রোন ও মিসাইল ইনস্টিটিউট স্থাপন, ২৬। কম্পিউটার ও আইসিটি প্রশিক্ষণের জন্য নেকটারকে আরো আধুনিক করে তা বিশ্বমানে উন্নীত করা, ২৭। দেশে বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণে সুবিধা বঞ্চিত এ অঞ্চলের শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া, ২৮। ফুলতলা হতে সাতমাথা পর্যন্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ গোহাইল রোডকে মাঝখানে ডিভাইডার দিয়ে দুই লেনে উন্নীত করা, ২৯। গোহাইল রোড ও শেরপুর রোডকে সংযোগকারী লিংক রোডগুলো সংস্কার ও প্রশস্ত করে যোগাযোগ উপযোগী করা, ৩০। উপশহর হতে কলেজ রোডকে সংযোগকারী লিংক রোডগুলো সংস্কার ও প্রশস্ত করে যোগাযোগ উপযোগী করা, ৩১। বিদেশী সহায়তায় আরো একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, ৩২। বেকার সমস্যা সমাধানে বগুড়ায় বড় কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করা, ৩৩। যানজট নিরসনে প্রয়োজনে উড়াল সড়কের পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ সড়ক নির্মাণ করা, শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় একটি জেলা ও তার সন্তানরা যে এতো বঞ্চিত হবে তা শুধু বগুড়ার অবকাঠামো, রাস্তাঘাট, কর্মসংস্থান হিসেব করলেই বুঝা যাবে। বর্তমান পটপরিবর্তনে বগুড়াবাসী অধির আগ্রহে চেয়ে রয়েছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার সুযোগ্য সন্তান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তথা হামাকেরে বগ্ড়ার সন্তান তারেক রহমানের দিকে। পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান সরকারের সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর উদ্যোগ এবং সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বগুড়াকে একটি আধুনিক, উন্নত, মডেল ও সমৃদ্ধ জেলায় পরিণত করা সম্ভব।
লেখক :
হাসান-উল-বারী
শিক্ষক, মিলেনিয়াম স্কলাস্টিক স্কুল এন্ড কলেজ
জাহাংগীরাবাদ সেনানিবাস, বগুড়া।