মশার কামড় না কয়েলের বিষ: সাধারণ মানুষের প্রাণ ভোমরা এখন কার হাতে?
নাগরিক জীবনে এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম মশা। সন্ধ্যা নামলেই প্রতিটি ড্রয়িংরুম থেকে শুরু করে বেডরুম—সবখানে শুরু হয় এক অসম যুদ্ধ। একদিকে মশার তীক্ষ্ণ হুল, অন্যদিকে সেই হুল থেকে বাঁচতে আমাদের জ্বালানো মশার কয়েলের ঘন নীল ধোঁয়া। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে এখন এক গভীর প্রশ্ন দানা বেঁধেছে-মশার কামড় বেশি ক্ষতিকর, নাকি যে কয়েল জ্বালিয়ে আমরা বাঁচার চেষ্টা করছি, তার ধোঁয়া? এক বিষ দিয়ে আরেক বিষ দমনের এই খেলায় আমরা আসলে কতটা নিরাপদ?
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, মশার কামড় আর কয়েলের ধোঁয়া—দুটোই শরীরের জন্য মারাত্মক। মশার কামড় মানেই ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া বা চিকুনগুনিয়ার মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি। বিশেষ করে এডিস মশার কারণে গত কয়েক বছরে দেশে যে মৃত্যুমিছিল আমরা দেখেছি, তা যে কাউকে আতঙ্কিত করার জন্য যথেষ্ট। কামড় থেকে বাঁচতে তাই কয়েল আমাদের অনিবার্য সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু গবেষণার তথ্য বলছে, একটি মশার কয়েল থেকে নির্গত ধোঁয়া প্রায় ১০০টি সিগারেটের সমান ক্ষতিকর। এই ধোঁয়া সরাসরি আমাদের ফুসফুসে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, এমনকি ক্যানসারের মতো রোগের বীজ বপন করছে। বিশেষ করে শিশুদের কোমল ফুসফুসের ওপর এই বিষাক্ত ধোঁয়ার প্রভাব অপূরণীয়। অর্থাৎ, আমরা এক মৃত্যুকূপ থেকে বাঁচতে গিয়ে আসলে অন্য এক ধীরগতির বিষাক্ত গহ্বরে ঝাঁপ দিচ্ছি।
মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য এই সংকট কেবল স্বাস্থ্যগত নয়, অর্থনৈতিকও বটে। গত এক বছরে নিত্যপণ্যের দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মশার কয়েলের দামও। আগে যে কয়েলের প্যাকেট হাতের নাগালে ছিল, এখন তা কিনতে গিয়েও পকেটে টান পড়ছে। একটি পরিবারে মশার উপদ্রব থেকে বাঁচতে মাসে কয়েকশ টাকার কয়েল বা স্প্রে কিনতে হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাধারণ মানুষ কেন নিজের পকেটের টাকা খরচ করে এই বিষ গিলবে? রাষ্ট্রের কি এখানে কোনো দায় নেই?
মশার উপদ্রব বাড়লে আমাদের সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভাগুলোর চিরচেনা দৃশ্য হলো ‘ফগিং’ বা কীটনাশক ছিটানো। কিন্তু এই কার্যক্রম নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবল অনাস্থা তৈরি হয়েছে। জনশ্রুতি আছে, সরকারের ছিটানো এই ওষুধে মশা মরে না, বরং মশা আরও শক্তিশালী হয়। অনেকেই রসিকতা করে বলেন, “সিটি কর্পোরেশনের ধোঁয়া দেখলে মশা হাসে!” কীটনাশকের মান নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। অনেক সময় দেখা যায়, কেবল লোকদেখানো ধোঁয়া ছিটানোর মাধ্যমেই দায়িত্ব শেষ করা হয়। আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করার যে টেকসই উদ্যোগ প্রয়োজন, তার অভাব প্রকট। ডাস্টবিন, নর্দমা বা যত্রতত্র জমে থাকা পানি পরিষ্কারের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের গাফিলতি মশার বংশবিস্তারকে আরও সহজ করে দিচ্ছে।
তাহলে সাধারণ মানুষের গন্তব্য কোথায়? একদিকে মশার কামড়ে রক্তশূন্যতা আর জ্বরের ভয়, অন্যদিকে কয়েলের ধোঁয়ায় ফুসফুস ঝাঁঝরা হওয়ার আশঙ্কা। এই দুরাবস্থার উত্তরণ কেবল কয়েল জ্বালিয়ে বা মশারিতে বন্দি থেকে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। শুধু লোকদেখানো ওষুধ ছিটানো নয়, বরং মশার প্রজনন উৎসগুলো চিহ্নিত করে সেখানে কার্যকর কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে। ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর তদারকি প্রয়োজন, যাতে জনগণের ট্যাক্সের টাকা কেবল ধোঁয়া হয়ে উড়ে না যায়।
পরিশেষে বলা যায়, মশার কামড় আর কয়েলের ধোঁয়া—দুটোই আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। আমরা চাই এমন এক পরিবেশ যেখানে সন্ধ্যার শান্তিতে কয়েলের বিষাক্ত ধোঁয়া বাধা হবে না, আর রাতের ঘুমে মশার হুল আতঙ্ক ছড়াবে না। বিষ দিয়ে বিষ ক্ষয়ের এই আত্মঘাতী পথ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে হবে ঠিকই, কিন্তু মূল দায়িত্বটা নিতে হবে রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসনকেই। নাগরিকের সুস্থভাবে বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করা কোনো করুণা নয়, বরং প্রশাসনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।
হাসান মো: শাব্বির
সাংবাদিক-প্রাবন্ধিক
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/166075