বগুড়া শহরে চারটি রেলক্রসিংয়ের যানজটে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে তিন কর্মঘণ্টা, ফ্লাইওভার নির্মাণের দাবি
মাসুদুর রহমান রানা : বগুড়ায় যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ শহরের বুক চিড়ে যাওয়া রেলপথের চারটি রেলক্রসিং। শহরের সেলিম হোটেলসংলগ্ন ১ নম্বর রেলঘুমটি, কবি নজরুল ইসলাম সড়কে থানা মোড়ের কাছে ২ নম্বর রেলঘুমটি, রাজাবাজার সংলগ্ন ৩ নম্বর রেলঘুমটি এবং বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজ নতুন ভবনের সামনে কামারগাড়ী মোড়ে রেলঘুমটিতে রয়েছে চারটি রেলক্রসিং।
প্রধানতঃ এই চার রেলক্রসিংয়ের জন্য যানজট হচ্ছে শহরে। যানজটে আটকা পড়ে মানুষের দিনে গড়ে নষ্ট হচ্ছে ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট কর্মঘণ্টা। তাই সরকারের কাছে দাবি উঠেছে রেলক্রসিংগুলোতে ফ্লাইওভার নির্মাণ অথবা শহরের বাইরে রেলপথ সরিয়ে নেয়ার। সচেতন মহল মনে করেন, এই রেল ক্রসিংগুলোতে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হলে মানুষ যানজট থেকে অনেকটা রক্ষা পাবে। অথবা শহরের বাইরে দিয়ে মাটিডালি বা বননীর দিক দিয়ে রেলপথ সরিয়ে নেয়া গেলে যানজট বহুলাংশে কমবে।
বগুড়া রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মো. সাজেদুর রহমান সাজু বলেন, ২৪ ঘণ্টায় ওই চারটিসহ অন্যান্য রেলক্রসিং দিয়ে আন্তঃনগর ১০টিসহ মোট ১৬টি ট্রেন চলাচল করে। এই ট্রেনগুলো চলাচলের সময় দুর্ঘটনারোধে গেইট বেরিয়ারগুলো ৮ থেকে ১০ মিনিট করে বন্ধ করে রাখা হয়। ট্রেন চলে গেলে গেইট বেরিয়ার খুলে দেওয়া হয়।
রেলের নিয়ম অনুয়ায়ী এটা করা হয়। তবে যানজটে পড়া অনেক ভুক্তভোগী বলছেন, শহরের যানজটের অন্যতম কারণ ওই রেলক্রসিংগুলো। এসব রেলক্রোসিংয়ে ফ্লাইওভার নির্মিত হলে যানজট কমবে। অথবা শহরের বাইরে দিয়ে রেললাইন সরিয়ে নিতে হবে।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) বগুড়া জেলা কামিটির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান নির্বাহী কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মাছুদার রহমান হেলাল বলেন, রেলওয়ে স্টেশন মাস্টারের তথ্যমতে বগুড়া শহরের অভ্যন্তরে ওই চারটিসহ অন্যান্য রেলক্রসিং দিয়ে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টায় ১৬টি ট্রেন চলাচল করে। প্রতিটি ট্রেন চলাচলের সময় ৮ থেকে ১০ মিনিট করে ১৬ বার গেইট বেরিয়ার ফেলে রাখতে হয় রেলক্রসিংগুলোতে। এতে রাস্তার দু’পাশে আটকা পড়ে শতশত যানবাহন।
সৃষ্টি হয় ভয়াবহ যানজটের। এই যানজটের ঢেউ আছড়ে পড়ে শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথাসহ অন্যান্য স্থানেও। সেই হিসেবে ২৪ ঘণ্টায় ১৬ বার ট্রেন চলাচলের সময় রেলক্রসিংগুলোতে যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে যানজটে আটকা পড়ে মানুষের ২৪ ঘণ্টায় গড়ে প্রায় ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। তিনি বলেন, মূল্যবান সময় অপচয় রোধে এবং যানজট থেকে রক্ষা পেতে ওই রেলক্রোসিংগুলোতে ফ্লাইওভার নির্মাণ অথবা রেললাইন সরিয়ে শহরের বাইরে মাটিডালি বা বনানীর দিক দিয়ে চলাচল করার ব্যবস্থা করতে পারলে যানজট অনেকটা কমবে।
তিনি আরও বলেন, অবৈধ যানবাহন, অবৈধ গাড়ি পার্কিংসহ নানা কারনেও শহরের সাতমাথাসহ বিভিন্ন স্থানে যানজট হচ্ছে। যানজট নিরসনে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা জরুরি। বগুড়া পৌরসভার সাবেক প্যানেল মেয়র আমিনুল ফরিদ বলেন, শুধু রেলক্রসিংয়ের জন্যই নয়, আরো নানা কারণে শহরে যানজট হচ্ছে। এরমধ্যে আরেক কারণ হলো-অবৈধ যানবাহন। শহরে লক্ষাধিক যানবাহন চলাচল করলেও এর মধ্যে অধিকাংশ যানবাহনই অবৈধভাবে চলাচল করে।
এছাড়া সড়কের একাংশ দখল করে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক, পিকআপ স্ট্যান্ড স্থাপন, অভৈধভাবে গাড়ি পার্কিং, ফুটপাত দখল, রাস্তা দখল করে হকারদের অবৈধ দোকান স্থাপনসহ নানা কারণে শহরে যানজট হচ্ছে। তিনি বলেন, যানজট নিয়ন্ত্রণে বনানী থেকে মাটিডালি, পুরান বগুড়া তিনমাথা থেকে সাতমাথা পর্যন্ত ও সরকারি আজিজুল হক কলেজ নতুন ভবনের সামনে থেকে সরকারি শাহ সুলতান কলেজ পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণ করা প্রয়োজন।
এছাড়া সাতমাথায় পথচারীদের রাস্তা পারাপারের জন্য ফুটওভার দরকার। তিনি যানজট নিরসনে ওই রেলক্রোসিংগুলো ও সাতমাথাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও ফ্লাইওভার নির্মাণের জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান। বগুড়া সদর ট্রাফিক বিভাগের ইনচার্জ ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই, প্রশাসন) মো. সালেকুজ্জামান খান বলেন, শহরের ওই চারটি রেলক্রেসিংয়ের কারণে যানজট বাড়ছে।
বিশেষ করে ট্রেন চলাচলের সময় যখন গেইট বেরিয়ার বন্ধ করা হয় তখন যানজট হয় তীব্র। যানজটে আটকা পড়ে কয়েকশ’ যানবাহন। এভাবে দিনে ১৬টি ট্রেন চলচলের সময় যানজট বাড়ে। এতে দুর্ভোগে পোহাতে হয় জন সাধারণকে। তিনি আরও বলেন, এই শহরে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে তিনগুণ বেশি যানবাহন চলে। শহরে ৪০-৫০ হাজার যানবাহন চলাচলের ধারণ ক্ষমতা থাকলেও এখন চলাচল করে লক্ষাধিক।
এর মধ্যে আবার প্রায় অর্ধলাখ যানবাহনের কোন বৈধ কাগজপত্র নেই বলেও তিনি জানান। তিনি বলেন, প্রতিদিনই নতুন নতুন অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন রাস্তায় নামছে। এসব যানবাহনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। অবৈধ যানবাহনই যানজট বাড়াচ্ছে। যে কারণে যানজট নিয়ন্ত্রণে অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে ট্রাফিক পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে। যানজট নিয়ন্ত্রণে ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/165738