বগুড়াকে ‘মডেল শিক্ষা নগরী’ হিসেবে গড়ে তুলতে মায়ের অপূর্ণ স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবেন তারেক রহমান
নাসিমা সুলতানা ছুটু : সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার লালিত স্বপ্ন ছিল উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বগুড়াকে একটি আধুনিক ‘মডেল শিক্ষা নগরী’ হিসেবে গড়ে তোলা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি শহরের প্রাচীন ও স্বনামধন্য দুটি বেসরকারি স্কুল (একটি ছেলেদের ও একটি মেয়েদের) সরকারিকরণ এবং একটি আন্তর্জাতিক মানের ইংরেজি ভার্সন স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু গত দুই দশকে সেই উদ্যোগগুলো এখনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক অনীহার বৃত্তে বন্দি হয়ে আছে।
তবে কুড়ি বছর পর বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বগুড়াবাসী নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন তার ছেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মায়ের সে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে বগুড়াকে ‘এডুকেশনাল হাব’ এ রূপান্তর করবেন। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন সরকার প্রধানের পরিকল্পনা অনুযায়ী-বগুড়া শহরের ছেলেদের জন্য ঐতিহ্যবাহী করোনেশন ইনস্টিটিউশন এবং মেয়েদের জন্য ইয়াকুবিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও সিটি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের যে কোন একটিকে সরকারি করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল।
এছাড়া, আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বগুড়াবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি পূরণে শহরের বিটাক (বাংলাদেশ শিল্প ও কারিগরী সহায়তা কেন্দ্র) সংলগ্ন এলাকায় একটি উন্নত মানের ইংরেজি ভার্সন স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য জমিও নির্বাচন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, জেলা শহর থেকেই শিক্ষার্থীরা যেন মানসম্মত ও আধুনিক শিক্ষা লাভ করতে পারেন।
পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওই স্থানের একটি অংশে সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা ভবন নির্মাণ করে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে ভবনটির উদ্বোধন করা হয়। এদিকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে বগুড়াবাসী পৌর শহরের দুটি স্কুলকে সরকারিকরণের দাবি জানিয়ে এলেও ওই সরকার বারবার শুধু প্রতিশ্রুতিই দিয়েছেন কিন্তু বাস্তবায়ন করেনি।
বগুড়া-৬ (সদর) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা সম্প্রতি জেলার শিক্ষকদের এক অনুষ্ঠানে এই দীর্ঘসূত্রয়িতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি এক বক্তব্যে বলেন, ‘বগুড়াবাসীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি ছিল দুটি প্রাচীন প্রতিষ্ঠানকে সরকারি করা।
বিগত সরকার কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে এই দাবি উপেক্ষা করেছে। বর্তমান সরকার বগুড়াকে সত্যিকারের ‘এডুকেশনাল হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দুটি স্কুল সরকারিকরণ এবং পূর্বনির্ধারিত স্থানে ইংরেজি ভার্সনের স্কুলটি স্থাপনের জন্য জোর দাবি জানাবো’।
এদিকে, বগুড়ার শিক্ষাবিদ ও সচেতন মহলের মতে, বগুড়ায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুপাতে সরকারি স্কুলের সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শফি মাহমুদ বলেন, বগুড়া উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান শিক্ষা কেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও এখানে পর্যাপ্ত সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় নেই। ভালো মানের ইংরেজি ভার্সনের স্কুল নেই।
ইয়াকুবিয়া ও করোনেশন ইন্সটিটিউশনকে সরকারি করা হলে হাজার হাজার সাধারণ পরিবারের শিক্ষার্থীরা মানসম্মত ও স্বল্প ব্যয়ে শিক্ষার সুযোগ তৈরি হবে। একইসাথে একটি সরকারি এবং যুগোপোযোগী ইংরেজি ভার্সনের স্কুল প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। সে সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি আর বলেন, সে সময় আমি একটি স্থানীয় পত্রিকা ও সরকারি সংবাদ সংস্থায় রিপোর্টার হিসেবে কাজ করতাম।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে দুটি স্থানেই আমি রিপোর্ট করেছিলাম। কিন্তু রাজনৈতিক পালাবদলে সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। বগুড়া বিয়াম মডেল স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমি তখন বগুড়ায় নতুন এসেছিলাম। তৎকালীন শিক্ষা সচিব শহীদুল আলমের কাছে বগুড়াকে মডেল শিক্ষা নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনার কিছু কিছু অংশ জেনেছিলাম।
এরমধ্যে অন্যতম ছিল-দুটি স্কুল সরকারিকরণ ও আধুনিকমানের ইংরেজি ভার্সনের স্কুল প্রতিষ্ঠা। সে সময় বিটাকের পাশে ‘বগুড়া মডেল স্কুল ও কলেজ (ইংরেজি ভার্সন)’ নামে একটি সাইনবোর্ডও ঝুলতে দেখেছিলাম।
বগুড়াকে প্রকৃত অর্থে একটি আন্তর্জাতিকমানের শিক্ষা নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফসর ড. মো. হাছানাত আলী একটি সুনির্দিষ্ট ও শক্তিশালী রূপরেখা তুলে ধরেছেন।
তার মতে, কেবল গতানুগতিক শিক্ষা নয়, বরং বহুমুখী ও বিশেষায়িত শিক্ষার সমন্বয়েই বগুড়াকে ‘এডুকেশনাল হাব’ করা সম্ভব। শহরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বেসরকারি স্কুলকে অবিলম্বে সরকারিকরণ করা। আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে অন্তত দুটি মানসম্মত ইংরেজি ভার্সন স্কুল প্রতিষ্ঠা। একটি পূর্ণাঙ্গ প্যারামেডিকেল কলেজ এবং একটি আধুনিক কৃষি কলেজ স্থাপন, শিল্পায়নের চাহিদা মেটাতে বেশকিছু নতুন কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।
বগুড়ায় এমন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা যেখানে একই ক্যাম্পাসের অধীনে মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষি এবং সাধারণ বিজ্ঞানের সব শাখা বিদ্যমান থাকবে। এদিকে বগুড়ায় বৈশাখী মেলার উদ্বোধন করে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপি বলেন, বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধন করে নতুন পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় আইন করা হচ্ছে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম হবে ‘বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়’। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যান্য বিভাগের মধ্যে-কৃষি বিভাগ, প্রোকৌশল বিভাগ ও চিকিৎসা অনুষদও চালু করা হবে। যাতে ভবিষতে বগুড়ায় প্রোকৌশল বা চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় করার প্রয়োজন না হয়। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনায় এসব করা হচ্ছে।
একই দিন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন বগুড়ায় শিক্ষকদের সাথে মতবিনিময়কালে জানিয়েছেন, বগুড়াকে দেশের প্রধানতম মডেল শিক্ষা নগরী ও এডুকেশনাল হাব হিসেবে গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে।
বগুড়ার সাধারণ নাগরিক ও অভিভাবকদের প্রত্যাশা, বর্তমান সংসদ সদস্য ও শিক্ষামন্ত্রীর নতুন আশ্বাসের ভিত্তিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সেই ‘মডেল শিক্ষা নগরী’র স্বপ্ন এবার তার সন্তান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে দ্রুত বাস্তবায়ন হবে।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/165736