মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব ফসলের মাঠে!
বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকার কড়াকড়ি সতর্কতা জারি করেছে। অফিস সময় পরিবর্তন, সন্ধ্যা ৬টার পর দোকানপাট বন্ধ, আলোকসজ্জা পরিহার এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গাড়ির ব্যবহার কমানো, রুট পরিকল্পনা এবং অপ্রয়োজনীয় ইঞ্জিন চালু না রাখা জ্বালানি সাশ্রয়ের উপায়। জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, অযথা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। জ্বালানি সংকট এড়াতে অযথা বা অবৈধভাবে বাড়িতে ও গাড়িতে তেল মজুত না করার জন্য কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরেও আতঙ্কিত হয়ে তেল কেনায় সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটছে। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিরাপদে তেল সংরক্ষণ ঝুঁকিপূর্ণ এবং এতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের আশঙ্কা থাকে, তাই পাম্প মালিক সমিতি অতিরিক্ত তেল না কেনার পরামর্শ দিয়েছে। মো: বাহরাম বাদশাহ, কাজলা, সারিয়াকান্দি, বগুড়া বোরো, ভুট্টা সহ ১৪-১৫ বিঘা জমিতে চাষ করে ডিজেল সরবরাহে ঘাটতি থাকায় বিপাকে পড়েছেন। প্রখর রৌদ্রোজ্জল আবহাওয়ায় ২/৩ দিন পর পর জমিতে সেচ দিতে হচ্ছে এবং মেশিনের আরপিএম বাড়িয়ে চালাতে হচ্ছে এতে তেল খরচ ও বেশী হচ্ছে ২০ লিটার ডিজেলের চাহিদার বিপরীতে পাম্প থেকে পাচ্ছেন ১০ লিটার অনুরূপে মোস্তাক আহমেদ, বাঙরা, শেরপুর, বগুড়া ও তেল সঙ্কটে বোরো ফসল ঘরে তোলার আশঙ্কা করেছেন, এ চিত্র দেশের প্রায় সর্বত্র। বোরো ফসলের ভরা মৌসুম চলমান, চারা রোপণ ও বাড়ন্ত পর্যায়ে সেচ কম লাগায় ডিজেলের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকে। বর্তমানে প্রজনন ও শীষ আসা পর্যায়ে সর্বোচ্চ পানির পরিমাণ প্রয়োজন হয় এ সময়ে সেচের জন্য ডিজেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা আবশ্যক। এদিকে সরকারি হিসেবে গত বছরের ধারাবাহিকতায় পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ আছে বলা হলেও বাস্তবে অনেকটাই মিলছেনা বলে ভোক্তারা ক্ষুব্ধ। মধ্যপ্রাচ্য সহ বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সরবরাহে নানামুখী পদক্ষেপের পরেও আশঙ্কা রয়েছে। কৃষকরা আশঙ্কা করছেন, যদি পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হয়, তাহলে বোরো মৌসুমে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে এবং মাঠের ফসল নষ্ট হয়ে গেলে অনেক পরিবারকে অনাহারে ও আর্থিক সংকটে পড়তে হবে। মেইন সেচের যেই সময়টা সেটা অতিবাহিত হয়েছে আর এবার বৈশাখের আগেই বেশ কয়েকবার আগাম বৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে সেচের পরিমাণটা কম লাগছে বলে জানায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। খুচরা বাজারে ডিজেল সংকট রয়েছে, কোথাও কোথাও লিটার প্রতি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ১৫-৮০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ৩০ মার্চ সোমবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মুনির হোসেন জানান, দেশে এক লাখ ৩৩ হাজার টন ডিজেলের উদ্বৃত্ত মজুত রয়েছে। তিনি বলেন, “ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে কিছু কার্গো বিলম্বিত হওয়ায় বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে একাধিক ডিজেলের চালান দেশে পৌঁছায়নি, যা সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে, পুরো এপ্রিলজুড়ে ধাপে ধাপে আরও কয়েক লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হবে। বর্তমানে দেশে বিদ্যমান মজুতের সঙ্গে নতুন তেল যুক্ত হলে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এপ্রিলে ডিজেলের মোট চাহিদার বিপরীতে বিপিসি ইতোমধ্যে সিঙ্গাপুরের ইউনিপ্যাক এবং ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি কোম্পানি থেকে বড় অংকের তেল আমদানির নিশ্চয়তা পেয়েছে। পাশাপাশি ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমেও ডিজেল আসার প্রক্রিয়া সচল রয়েছে। রবি মৌসুমে অন্যান্য শীতকালীন ফসলের পাশাপাশি বোরো ধানের আবাদও বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। বোরো দেশের প্রধান ধানের মৌসুম। এ বোরো মৌসুমে মোট জাতীয় উৎপাদনের ৬০ শতাংশ উৎপাদন হয়। যদিও ব্যাপক ভিত্তিতে বোরো ধানের আবাদ বেশি দিনের নয়। সেচপ্রযুক্তি সম্প্রসারণের আগের জামানায় ধানের প্রধান মৌসুম ছিল আমন ও আউশ। উন্নত সেচ ব্যবস্থাপনার সম্প্রসারণ, উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণের ফলে আউশ ধানের আবাদ কমতে থাকে এবং অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকে সেচনির্ভর বোরো ধানের। কিন্তু যৌক্তিক কারণেই বোরো ধানের আওতায় জমির পরিমাণ বাড়ার সুযোগ সীমিত হয়ে এসেছে। বোরো মৌসুমে মাঠভরা বোরো ধান দেখা গেলেও জলবায়ু পরিবর্তন, সেচের পানির সংকট ও আন্তঃফসল প্রতিযোগিতার ফলে ধীরে ধীরে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বোরো চাষ। এছাড়া তুলনামূলক লাভ-ক্ষতির হিসাব ও বিকল্প ফসলের সম্ভাবনা বিবেচনা করে কৃষক অতিরিক্ত সেচনির্ভর বোরো ধান চাষ থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে পানি সাশ্রয়ী ফসল যেমন: ভুট্টা, শাক-সবজি ও ডাল ফসল চাষে ঝুঁকে পড়ছেন। প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ফসলের বৈচিত্র্য বেড়েই চলেছে। কৃষক নানা রকম উচ্চমূল্য ফসলের দিকে ঝুঁকবে -এটাই স্বাভাবিক। ধান চাষ করে অব্যাহত লোকসানের কবলে পড়ে কৃষকরা শুধুই বিকল্প আবাদ খুঁজছে। বোরো ফলন বেশি হলেও উৎপাদন খরচ সবচেয়ে বেশি। প্রতি হেক্টর জমিতে সেচ বাবদ ২০-২২ হাজার টাকা খরচ হয়। হেক্টর প্রতি নিট মুনাফা শীতকালীন অন্যান্য ফসলের চেয়ে অনেক কম। সরকারি হিসেবে তিন মাসের জ্বালানি মজুতের কথা বলা হলেও ডিজেল সঙ্কটের সমাধান না হলে বোরো ধানের ফলন কমে যাবার আশঙ্কায় হতাশায় দিন গুনছেন কৃষকরা।
লেখক :
ফরিদুর রহমান
প্রাবন্ধিক ও কৃষিবিদ
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/165543