বগুড়া পৌরপার্কে বৈশাখী মেলায় মোরগ লড়াইয়ের উপাখ্যান

বগুড়া পৌরপার্কে বৈশাখী মেলায় মোরগ লড়াইয়ের উপাখ্যান

নাসিমা সুলতানা ছুটু : শহরের যান্ত্রিক ইট-পাথরের দেয়াল ঘেঁষে যেখানে প্রতিদিন ক্লান্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাস জমে, আজ সেখানে উড়ছে রঙিন আবির। বগুড়া সাংস্কৃতিক ফোরামের আয়োজনে মেলার গতকাল শুক্রবার ছিলো চতুর্থ দিন।

ছুটির সকালে যখন শহরের অধিকাংশ মানুষ ঘুমের আলস্যে বিভোর, তখনই দূর-দূরান্ত থেকে সিএনজি, রিকশা আর বাইকের শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে পার্কের চারপাশ। এই কোলাহল কোনো বিরক্তির নয়, এ যেন এক হারানো উৎসবকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ-ধ্বনি।

শহরের প্রাণকেন্দ্র্র পৌরপার্ক ও শহীদ টিটু মিলনায়তনের চত্বর জুড়েই বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে বৈশাখী মেলা। মেলার এক কোণে মাটির গন্ধ ম ম করছে। সেখানে দেখা মিলল নীলফামারীর সৈয়দপুর থেকে আসা মৃৎশিল্পী শ্রী জগদীশ চন্দ্র পালের।

সাথে তার ছেলে মানব পালসহ আরও পাঁচজন কারিগর। ক্রেতা সামলানোর ফাঁকে ফাঁকেই তারা নিপুণ হাতে রঙ করছেন বড় বড় মাটির ফুলদানিতে। শৈল্পিক সেই ব্যস্ততার মাঝে কথা হয় মানবের সাথে। তিনি কিছুটা বিষন্ন হাসি নিয়ে বললেন, ‘বাবা-দাদার আমল থেকে এই মাটিই আমাদের জীবন। সৈয়দপুর থেকে অনেক আশা নিয়ে প্রতিবারের মত এবারও বগুড়ার বৈশাখী মেলায় এসেছি।

কিন্তু এবার মেজাজটা একটু থমথমে, বিগত বছরগুলোর মতো বেচাকেনা এখনো জমে ওঠেনি। তবে যখন দেখি কোনো ছোট শিশু মাটির ঘোড়া হাতে নিয়ে হাসছে, তখন সব ক্লান্তি ভুলে যাই। মনে হয়, আমাদের শিল্পটা এখনো বেঁচে আছে ওদের হাত ধরে।  মানব বলেন, মেলার প্রথমদিকে মাটির তৈরি এসব পণ্য তেমন বিক্রি না হলেও শেষের দুইদিন ভালো বিক্রি হয়। তবে আগের তুলনায় দাম অনেক বেশি হওয়ায় বেচাকেনা আর আগের মত নেই।

পাশেই দাঁড়িয়ে মাটির তৈজসপত্র দেখছিলেন ওয়াসিয়া তানভীর নামে এক নারী। ওয়াসিয়ার একপাশে দাঁড়িয়েছিলো তার চার বছরের কন্যা আরেক পাশে সাত বছরের পুত্র। ওয়াসিয়া জানান, তিনি একজন কর্মজীবী নারী। অফিস থেকে বাসায় ফিরতে ফিরতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও মেলায় ঘুরতে আসা হয়নি।

কিন্ত আজ শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় সন্তানদের জেদ সামলাতে না পেরে সকাল সকালই মেলায় ঘুরতে এসেছেন। ওয়াসিয়া বেশ কিছু মাটির তৈজসপত্র কিনেছেন। তার চোখেমুখে তৃপ্তির আভা। তিনি বললেন ‘এখন তো সব প্লাস্টিক আর মেলামাইনের যুগ। কিন্তু মাটির এই হাঁড়ি-পাতিল বা ফুলদানির মধ্যে যে একটা আত্মার শান্তি আছে, তা অন্য কোথাও পাই না। এই কারিগররা আসলে মাটির পুতুলে প্রাণ দান করেন। তাদের কাজ দেখলে মনে হয় আমরা এখনো আমাদের শেকড়কে হারাইনি।

শহরের চেলোপাড়া থেকে মাটির পণ্য বিক্রি করা আরেক দোকানী জানান, দর্শনার্থীরা পণ্যগুলো নেড়েচেড়ে দেখছেন এবং অনেকে ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে কিনে নিচ্ছেন মাটির তৈরি শখের হাঁড়ি বা শো-পিস। কেউ কেউ শখ করে মাটির কাপ-পিরিচ, প্লেটও কিনছেন।

টিটু মিলনায়তন চত্বরে মাটির তৈরি খেলনা টমটম, বেলুনসহ বিভিন্ন খেলনার পসরা সাজিয়ে বসেছেন অনিল সরকার। কাহালু থেকে বৈশাখী মেলা করতে আসা অনিল জানান, সকাল ৯টার মধ্যে আমরা মেলায় এসে পসরা সাজিয়ে বসলেও মূল বেচাকেনা শুরু হয় বিকেলে।

পার্কের পুকুরের সম্মুখে মাটিতে মালা, দুল, চুড়ি ফিতার পসরা সাজিয়ে বসেছেন উত্তর চেলোপাড়ার দুলালী। দুলালীর কাছে এক ক্রেতা এসে কাঁচের চুড়ি খোঁজ করতেই দুলালী বললেন, কাঁচের চুড়ি দাম বেশি, তাই সবাই শুধু দরদাম করে চলে যায়, কেনেনা। তাই এবার মেলায় চুড়ি কাঁচের চুড়ি ওঠাই নাই। দুলালীর পাশেই ভ্যানে করে মেয়েদের চুড়ি-ফিতা দুল-কিলিপের দোকান থেকে চুলের পাঞ্চ কিলিপ কিনলেন তমা নামে এক তরুণী।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা তমা জানান, আজ ছুটির দিন থাকায় দুপুরের এই সময়টায় এসেছি মেলায়। এ সময় ভিড় কম থাকে তাই ঘুরেফিরে দেখে কেনাকাটা করা যায়। দুপুরের কড়া রোদে ভিড় কিছুটা কম থাকলেও বেলা গড়াতেই জনস্রোত আছড়ে পড়ে মেলা প্রাঙ্গন। বিকেলের সূর্যটা একটু হেলে পড়তেই ভিড় আছড়ে পড়ে পার্কের পশ্চিম প্রান্তে।

কারণ সেখানে শুরু হয়েছে মেলা কাঁপানো আয়োজন ‘মোরগ লড়াই’। শত শত মানুষের বৃত্তের মাঝখানে দুই যোদ্ধা মোরগ তাদের আভিজাত্য নিয়ে লড়ছে। দর্শকসারিতে উত্তেজনার ঢেউ। লড়াইয়ের জন্য মোরগ এনেছেন আখের, উজ্জ্বল, মুন্না ও রিজু।

শেষে নিজের বিজয়ী মোরগটিকে বুকে জড়িয়ে ধরা আখেরের চোখে দেখা গেল অন্যরকম এক গর্ব। হাঁপাতে হাঁপাতে তিনি বললেন, লড়াইয়ের জন্য মোরগটাকে নিজের বাচ্চার মতো খাইয়ে-দাইয়ে বড় করেছি। এটা শুধু একটা পাখি না, এটা আমার শখ, আমার ভালোবাসা। মানুষের এই হাততালি আর চিৎকারই আমার সব কষ্টের সার্থকতা।

মেলার এক কোণে শিশুদের জন্য নাগরদোলা ও ট্রেন ও বিশাল বড় এক ঝুলন্ত নৌকা রয়েছে। ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ আর ছোটদের কলকাকলিতে তৈরি হয়েছে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। আরেক কোনে রয়েছে চারপাশে নেট দিয়ে ঘেরা মাঝখানে কাপড়ের উপর লাফানোর ব্যবস্থা। ২০ টাকার টিকিটে ৮ মিনিট শিশুরা সেখানে লাফালাফি করতে পারে।

ছুটির দিন হওয়ায় সকাল থেকেই বাবা-মায়ের হাত ধরে এসে লাফালাফি করছে। রকমারি খেলনা, বাঁশি আর নকশা করা পাঁপড় কিংবা মচমচে জিলাপির গন্ধে মেলার বাতাস ভারী হয়ে আছে। গৃহিণীরা ব্যস্ত ঘর সাজানোর সামগ্রী আর কাঠের আসবাবপত্রের দরদাম নিয়ে।

এদিকে বৈশাখী মেলা মঞ্চে চতুর্থ দিন সন্ধ্যায় বগুড়া থিয়েটার ও কলেজ থিয়েটার যৌথভাবে মঞ্চায়ন করে পালানাটক কাজলরেখা।  ময়মনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে এটির নাট্যরূপ দিয়েছেন  রুবাইয়াত আহমেদ ও নির্দেশনা দিয়েছেন শহীদুর রহমান।

পালাটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন সোবহানি বাপ্পী, নাইমুল ইসলাম, নাহিদা পাঁপড়ি, গাজী আশা, দৃষ্টি রায়,শহীদুর রহমান শহীদ,আমিরুল ইসলাম রকি,মনিষা জামান সামান্তা,রাহুল ইসলাম স্মরণ, নূর ইসলাম, রবিউল করিম হৃদয়,  প্রিয়াস চন্দ্র বর্মন, অলক পাল, সংগীত পরিবেশনায় ছিলেন এ,টি,এম নজরুল ইসলাম, আবহ নির্মাণে ছিলেন বায়েজিদ নিবিড় ও মিষ্টি মমতা।

এছাড়াও এদিন মেলা মঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে গীতিচর্চা, শ্রুতিনন্দন, সুরতীর্থ সংগীত একাডেমি,  দোহার সংগীত নিকেতন, নৃত্যছন্দম আর্টস একাডেমি, সকালে অনুষ্ঠিত হয় শিশুদের আবৃত্তি ও লোক সংগীত প্রতিযোগিতা।

রাত নামলে যখন পার্কের আলোকসজ্জা জ্বলে ওঠে, তখন মেলার ধুলোর সাথে মিশে যায় মানুষের আবেগ। বগুড়া পৌর পার্কের এই বৈশাখী মেলা যেন কেবল কেনাবেচার বাজার নয়, এটি একটি বিশাল মিলনমেলা, যেখানে সৈয়দপুরের কারিগরের রঙ আর মোরগ লড়াইয়ের বীরত্ব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এক টুকরো মাটির সান্নিধ্যে এসে প্রতিটি মানুষ যেন আজ তার হারানো শৈশবকে নতুন করে খুঁজে পেল।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/165467