উপকূলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ: প্রতিমন্ত্রী
খুলনাসহ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মাটি ও পানির দূষণ টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম।
আজ শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সকাল ৯টায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক লিয়াকত আলী মিলনায়তনে আয়োজিত সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সয়েল, ওয়াটার এন্ড এনভায়রনমেন্ট ডিসিপ্লিনের উদ্যোগে ‘সয়েল, ওয়াটার এন্ড এনভায়রনমেন্টাল রেজিলিয়েন্স ইন দ্য কোস্টাল জোন অব বাংলাদেশ আন্ডার এ চেইঞ্জিং ক্লাইমেট’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, খুলনাসহ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল আজ জলবায়ু পরিবর্তনের এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি। ভৌগোলিক কারণেই এই জনপদ ‘রিয়েল ক্লাইমেট ভিকটিম’। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি করছে। আমাদের এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- কীভাবে আমরা এই বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলা করে টিকে থাকব।
তিনি বলেন, 'এ অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মাটি ও পানির দূষণ টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে রামপাল, মোংলা, কয়রা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে এই সমস্যা প্রকট। এসব সমস্যা মোকাবেলায় কার্যকর ও প্রকৃতি-নির্ভর সমাধান খুঁজে বের করতে এ ধরনের সম্মেলনের গুরুত্ব অপরিসীম।'
প্রতিমন্ত্রী বলেন, 'আমাদের অস্তিত্বের স্বার্থেই বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করতে হবে। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন আজ বহুমুখী সংকটের সম্মুখীন। সুন্দরবনকে বাঁচাতে হলে আমাদের এখনই সম্মিলিত পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিবেশের এই বিপর্যয়ের জন্য আমরাও কোনো না কোনো ভাবে দায়ী। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় শিক্ষার্থী ও কৃষকদের সম্পৃক্ত করে গবেষণার মাধ্যমে সমস্যাগুলো গভীর ভাবে অনুসন্ধান করতে হবে।'
তিনি বলেন, 'যেকোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য মানসম্মত গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। সঠিক গবেষণাই টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল এনে দিতে পারে।'
প্রতিমন্ত্রী খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সয়েল, ওয়াটার এন্ড এনভায়রনমেন্ট’ ডিসিপ্লিনের গবেষণার প্রশংসা করেন। একইসঙ্গে এসব সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাস্তবভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলের সমস্যার সমাধান বের করার আহ্বান জানান।
চিফ প্যাট্রন হিসেবে বক্তব্য রাখেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. রেজাউল করিম।
তিনি বলেন, 'জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ লবণাক্ততা, পানির সংকট ও ভূমি অবক্ষয়ের মতো গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, যা তাদের জীবন-জীবিকায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে। উপকূলের নিকটবর্তী একটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষা ও গবেষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না; বরং সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে বাস্তব সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে চায়। এ লক্ষ্যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারডিসিপ্লিনারি গবেষণা জোরদার করা হচ্ছে এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে গবেষণালব্ধ জ্ঞান বাস্তব পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে।'
তিনি বলেন, 'এ ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন গবেষক, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে, যা উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বাস্তবসম্মত সমাধান উদ্ভাবনে সহায়ক। এ সম্মেলন থেকে নতুন ধারণার সৃষ্টি, পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়ে উঠবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি সম্মেলন আয়োজনের জন্য সয়েল ওয়াটার এন্ড এনভায়রনমেন্ট ডিসিপ্লিনের সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান। একইসঙ্গে তিনি দেশ-বিদেশের আগত অতিথি বক্তাদের অংশগ্রহণের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. হারুনর রশীদ খান, বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান স্কুলের ডিন প্রফেসর ড. মো. গোলাম হোসেন, বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) মো. আমির হোসেন চৌধুরী এবং ছাত্র বিষয়ক পরিচালক প্রফেসর ড. মো. নাজমুস সাদাত।
সম্মেলনের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চীনের চাইনিজ একাডেমি অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেস-এর প্রফেসর ড. শিনহুয়া পেং। সভাপতিত্ব করেন সংশ্লিষ্ট ডিসিপ্লিনের প্রধান প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জাবের হোসেন।
অনুষ্ঠানে সম্মেলনের অতিথিবৃন্দ ও কী-নোট স্পিকারের হাতে আয়োজকদের পক্ষ থেকে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়।
সম্মেলনের দ্বিতীয় পর্বে অতিথি বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন জাপানের ইউনিভার্সিটি অব ইয়ামানাশির ড. রিওটা কাতাওকা এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. এম জহিরুদ্দিন।
দুপুরের বিরতির পর টেকনিক্যাল সেশন অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে গবেষকরা ওরাল ও পোস্টার উপস্থাপনার মাধ্যমে তাদের গবেষণালব্ধ ফলাফল তুলে ধরেন। এই পর্বে দুই শতাধিক গবেষণালব্ধ ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।
সম্মেলনে বাংলাদেশ, জাপান, চীনসহ বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীসহ তিন শতাধিক প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন।
আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর প্রতিমন্ত্রী খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নং একাডেমিক ভবনের গ্রাউন্ড ফ্লোরে দেশের মধ্যে প্রথম স্থাপিত সয়েল আর্কাইভ পরিদর্শন করেন। সেখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাটির নমুনা দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং সংগৃহীত মাটির মাধ্যমে নানামুখী গবেষণার দ্বার উন্মোচিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
এর আগে সকালে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছালে উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. রেজাউল করিম তাকে স্বাগত জানান।
এ সময় তিনি প্রতিমন্ত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম খচিত ক্রেস্ট উপহার দেন। পরে প্রতিমন্ত্রী ও উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অদম্য বাংলা চত্বরে বৃক্ষরোপণ করেন।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/165423