বাংলা সংস্কৃতির মূল্যবোধের বহিপ্রকাশ ১লা বৈশাখ
বিশ্বের যে কোনো অঞ্চলের যে কোন জনগোষ্ঠী তাদের দৈনন্দিন জীবনধারার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তাদের আচার-আচরণ, কলাকৌশল, ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাস, নিজস্ব শিল্পকলা, প্রথাগত ধ্যানধারণা, ভাষা এবং মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশ যাকে আমরা সংস্কৃতি বলে থাকি। উপরোক্ত বিষয়গুলোর ভাবধারা সর্বত্র এক হলেও অঞ্চলভেদে সংস্কৃতির ভিন্নতা যথেষ্ট পরিমাণ বিদ্যমান। সংস্কৃতি অত্র অঞ্চলের শত-শত এমনকি হাজার-হাজার বছর যাবত প্রজন্মের পর প্রজন্মের হাত ধরে জ্ঞান, আচরণ, প্রথা, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের যৌক্তিক এবং মৌলিক এক অধ্যায়। সংস্কৃতিই শেখায় মানুষের তৈরি কৌশল যা সমাজের আইনকানুন, রীতিনীতি, নিয়মানুবর্তিতা, রুচিশীলতা ও সৃজনশীলতার মার্জিত রূপকে। পাশাপাশি মানুষের পরিচয়, ব্যক্তিত্ব ও স্বাতন্ত্র্যবোধকে জাগ্রত করে। সংস্কৃতিকে দুইটি ভাগে ভাগ করা যায় প্রথমত বিশ্বাস ও মূল্যবোধের সংস্কৃতি বলতে সমাজের নিয়মনীতি, সামাজিক প্রথা ও দায়দায়িত্ব, ধর্ম, আদর্শ ও নৈতিকতা, বিবেক ও মনুষ্যত্ববোধ, সহমর্মিতা বোধ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ইত্যাদিকে বোঝায়। আর দ্বিতীয় মানুষের জীবনধারার সাথে জড়িত সংস্কৃতি যেমন খাওয়া-দাওয়া, পোশাক পরিচ্ছদ, নিজস্ব ভাষা, কর্মক্ষেত্র, বিভিন্ন উৎসব পালন যেখানে থাকবে না কোনো ধর্ম বর্ণ ও জাতি উপজাতির মাঝে ভেদাভেদ। সংস্কৃতি একটা জাতির শেকড়, সংস্কৃতি যেখানে বাধাগ্রস্ত হয়, তখন সেই জাতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এটা নিশ্চিত বলা যায়। বিশ্বের বহু উন্নত দেশ তাদের আধুনিকতা ও হাজারো উন্নয়নের পাশাপাশি মনে প্রাণে ধারণ করে তাদের সংস্কৃতিকে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় আমাদের দেশে দীর্ঘ বেশ কয়েক বছর ধরে আকাশ সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের বদৌলতে চলছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং অপসংস্কৃতির নোংরা প্রতিযোগিতা। এই আগ্রাসনের করালগ্রাসে দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের বাংলা মাসের নির্দিষ্ট কিছু কিছু তারিখে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরে গ্রামে বিভিন্ন নামে মেলা, ওরশ কিংবা ইসলামি জলসার নামে মেলা, আর ওই মেলা কে কেন্দ্র করে আত্মীয় স্বজনের পদচারনায় মুখরিত বাড়ির পরিবেশ। ঈদের দাওয়াত এতোটা গুরুত্ব বহন করে না যতোটা না গুরুত্ব বহন করে মেলায় দাওয়াত না দেওয়া কে। ভিনদেশীও সিনেমা নাটক গান বিনোদন মুলুক অনুষ্ঠানের প্রতি আমরা আকৃষ্ট হচ্ছি আর হারিয়ে ফেলছি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন, বঙ্কিমচন্দ্র, জীবনানন্দ, জসীমউদ্দিন, আমাদের বাউল সংগীত, যাত্রাপালা, পালাগান, কবি লড়াই, জারীগান, মেলার তাৎপর্য সহ আঞ্চলিকতার ভিত্তিতে নানান অনুষ্ঠান। আমাদের চিরাচরিত খাবারের জায়গায় জায়গা করে নিয়েছে ফাস্টফুড, চাইনিজ, সিচুয়াং, সী ফুড, ইন্ডিয়ান সহ হরেক রকমের নামজানা অজানা বিদেশি খাবার। পোষাক পরিচ্ছন্নেও এসেছে আমুল পরিবর্তন যা কুরুচিপুর্ণ ও অশালীনতায় ভরপুর। সব জেনে শুনে বুঝেও নিজস্ব ঐতিহ্য কে পদদলিত করে আকৃষ্ট হচ্ছি অপসংস্কৃতি বেড়াজালে। এই বিষয়ে শুধু যুব সমাজই নয় বরং সব বয়সের মানুষ কেউ ভালো ভাবে বুঝে আবার কেউ কিছুই না বুঝে ভিন দেশীয় এজেন্ডা অত্যন্ত গোপনে এবং সুচতুর ভাবে কূটকৌশলে বাস্তবায়নের নেশায় মেতে উঠে এই দেশের কিছু বুদ্ধিজীবী, বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ, সুশীল সমাজের একটা অংশ। এরা ১লা বৈশাখ কে সর্বপ্রথম বেছে নেয় এবং বৈশাখের চিরচেনা অনুষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে হতে থাকে অচেনা। অথচ সকল ধর্ম বর্ণ জাতি উপজাতি দের প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ অর্থাৎ ১লা বৈশাখ। বৈশাখী নানামুখী অনুষ্ঠান সেই প্রাচীন কাল থেকে শহরে বন্দরে গ্রামে পাহাড়ে সমতলে ভিন্নমাত্রার উৎসবের আমেজ বিরাজ করে। এই ১লা বৈশাখ কে আরো নতুনত্ব, সার্বজনীন ও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগানোর উৎপত্তিস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট। বহু বছর ধরে এই স্থান থেকে বেড় হওয়া আনন্দ শোভাযাত্রা রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে আসে বৈশাখী অনুষ্ঠান স্থলে, সারাদিন ব্যাপী চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যা উপস্থিত দর্শকদের ক্ষনিকের জন্য হারিয়ে ফেলে হাজার বছর আগে। আবহমান কাল থেকে আসা এই বৈশাখী উদযাপনে অদৃশ্য ইশারায় ঘটে হটাৎ ছন্দপতন। কুচক্রী মহলের নীলনকশায় আনন্দ শোভাযাত্রার নাম হয়ে যায় মঙ্গল শোভাযাত্রা। সেখানে প্রদর্শিত হতে থাকে একটা নির্দিষ্ট ধর্মের নানান প্রতিকৃতি। ওই একই সময় থেকে এটাও দেখা যায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরুর প্রাক্কালে “মঙ্গল প্রদীপ“ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শুরুর প্রক্রিয়া। যা অনেকের হৃদয়কে করে প্রশ্নবিদ্ধ, ব্যথিত চিত্তে উদ্বেগ ভরা মননে শুধু দর্শন করে কিন্তু কিছুই বলার থাকে না। সকল ধর্মের প্রতি শতভাগ সম্মান রেখে বলার সময় এসেছে বিশ্বে একমাত্র উদাহরণ স্বরুপ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অটুট বন্ধনের নিদর্শন এই বদ্বীপ অঞ্চলে নির্ভেজাল সংস্কৃতি পালনের মাঝে কে বা কারা এই সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপনের প্রক্রিয়া শুরু করলো। বিষয়টি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার কোনোই প্রয়োজন নেই কারণ সবার কাছে পরিষ্কার কাদের ইন্ধন আছে এদের পেছনে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চেতনা ফিরেছে এটাই সান্ত্বনা, হারিয়ে যেতে বসা আমাদের সংস্কৃতির স্বকীয়তা বজায় রেখে এবারের ১লা বৈশাখ পালিত হোক আর এটাই হোক সমগ্র দেশবাসীর বৈশাখী অঙ্গিকার। সবাইকে জানাই বৈশাখী শুভেচ্ছা, শুভ বাংলা নববর্ষ।
লেখক :
শাব্বীর পল্লব
প্রাবন্ধিক ও গবেষক
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/165199