গণপরিবহনের ভাড়া নিয়ন্ত্রণে এত অবহেলা কেন

গণপরিবহনের ভাড়া নিয়ন্ত্রণে এত অবহেলা কেন

ছুটি পেলেই বিভিন্ন মহাসড়কে ঘরমুখী মানুষের সংখ্যা বেড়ে যায়। বাস, ট্রেন, লঞ্চ ইত্যাদি যাতায়াতের মাধ্যমগুলোতে উপচেপড়া ভিড় দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে সিংহভাগ মানুষ নির্ভর করে বাসযাত্রার ওপর। আর এই ভিড়কেই পুঁজি করে একশ্রেণির বাস মালিক ও চালক ভাড়া দুইগুণ এমনকি তিনগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে। লোকাল বাস থেকে শুরু করে দূরপাল্লার পরিবহন তাদের ভাড়া অতিরিক্ত হারে বৃদ্ধি করে। ফলে বাড়ি ফেরাটা শুধু শারীরিক ও মানসিক কষ্টকর বিষয় নয় বরং অর্থনৈতিকভাবেও সাধারণ মানুষ চরম বিপাকে পড়ে। বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ছুটির মুহূর্তে তদারকি ও যাত্রীদের নানা অভিযোগ চোখে পড়ে কিন্তু এর কার্যকর সমাধান দেখতে পাওয়া যায় না। ঈদ, পূজা, সরকারি ছুটি কিংবা নির্বাচনের মুহূর্তে ছুটির সময় দেখা যায় প্রশাসনের তৎপরতা, ভ্রাম্যমাণ আদালত, ভাড়া তালিকা টানানো, অভিযোগ গ্রহণের হটলাইন ইত্যাদি। এছাড়া সংবাদমাধ্যমেও ভাড়া নৈরাজ্যের বিভিন্ন খবর ছাপা হয়। কিন্তু তদারকির মুহূর্তে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও পরবর্তী সময়ে এ সমস্যার কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান চোখে পড়ে না। কেউ প্রতিবাদ করলে অপমান, ঝগড়া কিংবা বাস থেকে নামিয়ে দেওয়ার হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়। ফলে যাত্রীরা অধিকাংশ সময় মুখ বুজে বাড়তি ভাড়া দিতে বাধ্য হয়। এই নীরব সম্মতিই যেন অনিয়মকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। এই অব্যবস্থার পেছনে একটি বড় কারণ হলো পরিবহন খাতে দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেটের সংস্কৃতি। নির্দিষ্ট কিছু মালিক ও সংগঠন কার্যত ভাড়া নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে। গণপরিবহন একটি জনসেবামূলক খাত হওয়া সত্ত্বেও এটি এখন অনেকাংশেই মুনাফাকেন্দ্রিক ব্যবসায় রূপান্তর হয়েছে। ভাড়া বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ হলো নজরদারির ঘাটতি। সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন ও ট্রাফিক বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট দেখা যায়। কোথাও কোথাও ভাড়া তালিকা ঝুলানো থাকলেও তা মানানো হয় না। এমনকি যাত্রীরা জানে না কোথায় অভিযোগ করবে, করলেও প্রতিকার পাবে কি না। ফলে ভাড়া নৈরাজ্য একপ্রকার স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধে শুধু তাৎক্ষণিক অভিযান যথেষ্ট নয় বরং প্রয়োজন স্থায়ী ও কাঠামোগত ব্যবস্থা। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, প্রতিটি বাসে দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শনের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং তা মানা হচ্ছে কি না—নিয়মিতভাবে মনিটরিং ব্যবস্থা নির্ধারণ করতে হবে। সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন ও ট্রাফিক বিভাগের মধ্যে সমন্বিত তদারকি জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে সরকারি ছুটির সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও তদারকি টিম সক্রিয় রাখতে হবে। নিয়ম ভাঙলে জরিমানা নয়, লাইসেন্স বাতিল ও রুট পারমিট স্থগিতের মতো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া যাত্রীদেরও সচেতন ও সংগঠিত হতে হবে। তাই অবহেলা নয়, জনগণ ও প্রশাসনের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমেই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।


লেখক :

রাখি আক্তার

শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান 
ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/164720