বগুড়ার শিল্পায়ন: অপেক্ষমাণ প্রতিশ্রুতি
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক মানচিত্রে বগুড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। এক সময় সুতা কাটার কল, বিড়ি, ম্যাচ ও সিরামিক কারখানার মাধ্যমে শিল্পনগরী হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই জেলা এখন দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বগুড়ায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছড়িয়ে আছে। ফুলবাড়ি এলাকায় স্থাপিত শিল্পনগরী ছাড়াও বগুড়া শহর জুড়ে আছে অসংখ্য কলকারখানা। যমুনা সেতু চালু হওয়ার পর যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসায় ঢাকা-চট্টগ্রামের সঙ্গে বগুড়ার সংযোগ আরও জোরালো হয়েছে, যা এখানকার বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। কিন্তু সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তবতার কঠিন দেয়াল যেন বগুড়ার শিল্পায়নকে পূর্ণ বিকাশ লাভে বাধা দিয়ে আসছে। প্রশাসনিক জটিলতা, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা, অবকাঠামো সংকট, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং নদী দখলের মতো পরিবেশগত সমস্যা নানা প্রতিবন্ধকতায় জর্জরিত এই অঞ্চলের শিল্প-উদ্যোগ। বগুড়ার শিল্পায়নের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চরম ধীরগতি। ২০১৪ সালে বগুড়ায় একটি বৃহৎ শিল্পনগরী স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে সাবগ্রামে ১৫০ একর জমিতে প্রকল্পটি নেওয়ার কথা থাকলেও জমির দাম ও নিম্নভূমির কারণে সেটি বাতিল করা হয়। ২০১৮ সালে শাজাহানপুর উপজেলায় ৩০০ একর জমি চিহ্নিত করে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি এখনো কাগজ-কলমেই আটকে আছে। প্রাথমিক জরিপে ত্রুটি ধরা পড়ায় প্রকল্প প্রস্তাবটি নাকচ হয়ে যায়। পরে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নসহ নতুন জরিপ করা হলেও তা চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে আরও সময় লাগছে।
এই শিল্পনগরীটি বাস্তবায়িত হলে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হতো এবং সরকারের রাজস্ব আয় হতো প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের সম্ভাবনা ছিল চার হাজার কোটি টাকার মতো। বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতারা জানিয়েছেন, বিনিয়োগের আগ্রহ থাকলেও উপযুক্ত জায়গার অভাবে উদ্যোক্তারা ভোগান্তিতে পড়ছেন। এই দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা প্রমাণ করে, শুধু পরিকল্পনা করলেই হয় না; প্রয়োজন সময়োপযোগী বাস্তবায়ন। শিল্পায়নের প্রাণ হলো যোগাযোগ ব্যবস্থা। ১৯৯৮ সালে যমুনা সেতু চালু হওয়ার পর বগুড়ার সাথে রাজধানীর দূরত্ব কমে আসে, যা শিল্প বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। কিন্তু এরপরও যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন স্থবির হয়ে আছে। মাত্র ১ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে সড়ক ও জনপথ বিভাগের পাঁচ বছর সময় লেগে যাওয়ার মতো উদাহরণ থেকে বোঝা যায় পরিকাঠামো উন্নয়নে কতটা অদক্ষতা ও ধীরগতি কাজ করছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেললাইন প্রকল্প। ২০১৮ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় অনুমোদনের পর সাত বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের কাজ এগোয়নি। ভারতের ঋণ সহায়তা না পাওয়ায় এবং খরচ দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পটি বার বার পিছিয়েছে। সম্প্রতি এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) অর্থায়নে আগ্রহ প্রকাশ করলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এই রেললাইন চালু হলে বগুড়া থেকে ঢাকার দূরত্ব কমে পাঁচ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা সম্ভব হতো, যা শিল্পপণ্য পরিবহন ও শ্রমিক চলাচলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনত। দুটি বড় নদীর ওপর সেতু নির্মাণসহ পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গের অন্তত আট জেলার অর্থনীতির চেহারা বদলে যেত। শুধু বড় শিল্প নয়, বগুড়ার প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পও নানাভাবে বাধার মুখে পড়েছে। জেলার প্রায় দুই হাজার মৃৎশিল্পী পরিবার প্রায় শত বছর ধরে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পের সাথে জড়িত। দইয়ের পাত্র তৈরিতে এই শিল্পীরা অনন্য দক্ষতার পরিচয় দিলেও বর্তমানে তারা টিকে থাকার জন্য হিমশিম খাচ্ছেন। কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া, জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিন ধরে পণ্যের দাম অপরিবর্তিত থাকায় তাদের আয় প্রায় নেই বললেই চলে। একজন কারিগর জানিয়েছেন, একটি ট্রাক কাদামাটির দাম ৪-৫ হাজার টাকা হলেও তা থেকে তৈরি প্রায় দশ হাজার ট্রে বিক্রি করে খরচ উঠানোই দায়। এমন পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে অনেকে বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকে ১২-১৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিচ্ছেন। অথচ বিসিকের মতো সরকারি সংস্থা থেকে ৪-৭ শতাংশ সুদে ঋণ নেওয়ার সুযোগ থাকলেও তা পেতে জটিল প্রক্রিয়া পেরোতে হয়। একাধিক নথিপত্র, দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং জমির জটিলতার কারণে অধিকাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। বিসিকের কর্মকর্তারা নিজেরাই স্বীকার করেন, আধুনিকায়নের চাপে এই শিল্পটি হারিয়ে যেতে বসেছে।
শিল্পায়নের আরেক বড় বাধা হলো নদী দখল ও পরিবেশগত অবক্ষয়। এর একটি উদাহরণ দেখা যায় করতোয়া নদীর তীরে। নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ বন্ধ করে ফেলার কারণে আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ দূষণ দেখা দেয়। সম্প্রতি জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের যৌথ অভিযানে এই দখল উচ্ছেদ করা শুরু হয়েছে। নদী দখলের মতো ঘটনা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।বগুড়ার শিল্পায়নের বাধাগুলো চিহ্নিত করা গেলেও এখন প্রশ্ন হলো, উত্তরণের পথ কোথায়? শিল্পনগরী স্থাপনের প্রকল্পটি আর দেরি না করে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। ২০১৪ সালে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, আজ তা বাস্তবায়িত হলে জেলার শিল্পের চেহারা বদলে যেত। পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ও জরিপের জটিলতা যত দ্রুত সম্ভব সমাধান করে প্রকল্পের কাজ শুরু করতে হবে। পাশাপাশি সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেললাইন প্রকল্পের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পটির ব্যয় বাড়লেও এটি বাস্তবায়নের গুরুত্ব অপরিসীম। আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ ও উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য এই রেলপথ একটি গেম চেঞ্জার হতে পারে। সরকারের উচিত এআইআইবি বা অন্য কোনো উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার অর্থায়ন দ্রুত চূড়ান্ত করা এবং প্রকল্পের কাজ শুরু করা। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে বাঁচাতে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ সহজলভ্য করতে হবে। বিসিকের সুদ ৪-৭ শতাংশ রাখার পাশাপাশি ঋণ প্রক্রিয়াকে সহজীকরণ জরুরি। মৃৎশিল্পের মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্প সংরক্ষণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে হবে। আধুনিকায়নের চাপে টিকে থাকতে এ শিল্পে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও মার্কেটিং সহায়তা দেওয়া উচিত। নদী দখল ও পরিবেশ ধ্বংস রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। করতোয়া নদী উচ্ছেদ অভিযানের মতো উদ্যোগ নিয়মিত করতে হবে এবং দখলকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শিল্পের নামে নদী ভরাট বা পরিবেশ ধ্বংসের ঘটনা আর যেন না ঘটে, সেদিকে কঠোর নজরদারি জরুরি। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসন, শিল্প মালিক সমিতি ও চেম্বার অব কমার্সের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে এদের ভূমিকা অপরিহার্য।বগুড়ার শিল্পায়নের গল্প সম্ভাবনা আর প্রতিবন্ধকতার এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে আবর্তিত। একদিকে যোগাযোগের সুবিধা, উদ্যোক্তাদের আগ্রহ এবং সম্পদের প্রার্চুয; অন্যদিকে প্রশাসনিক জটিলতা, অবকাঠামো সংকট ও অর্থায়নের অভাব। তবে সব প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে বগুড়া একদিন শিল্পনগরী হিসেবে পূর্ণ বিকাশ লাভ করবে- এই আশা ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। সরকারের নীতি-নির্ধারক, স্থানীয় প্রশাসন এবং উদ্যোক্তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাধাগুলো অতিক্রম করা সম্ভব। কেবল প্রয়োজন আন্তরিকতা আর সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এক যুগ ধরে আটকে থাকা শিল্পনগরী আর সাত বছর অপেক্ষার প্রহর গোনা রেলপথ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বগুড়া শুধু উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির চালিকাশক্তিই নয়, পুরো দেশের শিল্প মানচিত্রে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত হবে। আর প্রান্তিক মৃৎশিল্পী থেকে শুরু করে বড় উদ্যাক্তা সবার জন্যই অপেক্ষা করছে সেই সোনালি ভবিষ্যৎ। সময় এখন আর অপচয়ের নয়, বরং সুযোগের সদ্ব্যবহারের।
লেখক :
মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান
পিএইচডি গবেষক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়