অলীক ইউরোপের স্বপ্ন নাকি মৃত্যুর দিগন্ত

অলীক ইউরোপের স্বপ্ন নাকি মৃত্যুর দিগন্ত

‘ইউরোপ’ একটি শব্দ, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে উন্নত জীবন, অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য আর স্বপ্নময় ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু এই স্বপ্নের পেছনে ছুটতে গিয়ে প্রতি বছর অসংখ্য তরুণ পা বাড়ায় অনিশ্চিত, বিপজ্জনক এক পথে যার শেষ প্রান্তে অনেক সময়ই অপেক্ষা করে মৃত্যু, না-পাওয়া আর অচেনা এক শূন্যতা। সাম্প্রতিক ঘটনায় ২২ জন বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যু আবারও আমাদের সামনে সেই কঠিন বাস্তবতাকে উন্মোচিত করেছে। উত্তাল সাগরে ভাসতে ভাসতে নিভে গেছে তাদের জীবন, আর তাদের দেহও ফিরতে পারেনি মাতৃভূমির কোলে। এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয় বরং এটি একটি ধারাবাহিক ট্র্যাজেডির অংশ।

জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা (IOM) ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে গত এক দশকে ২৫,০০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। প্রতি বছর গড়ে হাজার হাজার অভিবাসী সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ দক্ষিণ এশিয়ার, বিশেষ করে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আগত। ২০২৩ সালেই ভূমধ্যসাগরে প্রায় ৩,০০০ মানুষের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এই সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয় প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি অপূর্ণ গল্প। 

প্রশ্ন হচ্ছে কেন এই ঝুঁকি? কেন একজন তরুণ নিজের জীবন হাতে নিয়ে এমন দুঃসাহসী পথে পা বাড়ায়? প্রথমত, অর্থনৈতিক আকাক্সক্ষা ও সামাজিক চাপ একটি বড় কারণ। দেশে বেকারত্বের হার, আয়ের সীমাবদ্ধতা এবং দ্রুত সাফল্যের লোভ অনেককে শর্টকাট খুঁজতে বাধ্য করে। অনেক সময় গ্রাম বা ছোট শহরের তরুণদের কাছে ইউরোপ মানেই “স্বর্গ” যেখানে একবার পৌঁছাতে পারলেই জীবনের সব সমস্যার সমাধান। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। ইউরোপে অবৈধভাবে প্রবেশ করা মানেই অনিশ্চিত জীবন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, শ্রম শোষণ, এমনকি আটক বা বহিষ্কারের ঝুঁকি। দ্বিতীয়ত, মানবপাচারকারী চক্র বা দালালদের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। তারা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে, রঙিন স্বপ্ন দেখিয়ে, অনেক সময় পরিবারসহ পুরো সমাজকে প্রভাবিত করে। একটি যাত্রার জন্য ৫ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় যা অনেক পরিবার জমি বিক্রি বা ঋণ নিয়ে জোগাড় করে। অথচ সেই টাকায় দেশে ছোট ব্যবসা, কৃষি উদ্যোগ বা দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে টেকসই জীবিকা গড়ে তোলা সম্ভব।

তৃতীয়ত, আমাদের মানসিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধের একটি সংকট এখানে স্পষ্ট। আমরা অনেক সময় “বিদেশে থাকা”কে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখি। ফলে, দেশে ছোট বা মাঝারি পেশাকে আমরা অবমূল্যায়ন করি। এই মানসিকতা তরুণদের এমন এক প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেয়, যেখানে তারা বাস্তবতার চেয়ে কল্পনাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এখন প্রশ্ন এর সমাধান কোথায়? প্রথমত, সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এই বিষয়গুলো নিয়ে আরও জোরালোভাবে কাজ করতে হবে। বাস্তব গল্প, পরিসংখ্যান ও ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা সামনে আনতে হবে।

দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। সরকার ও বেসরকারি খাতে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে তরুণদের জন্য টেকসই আয়ের পথ তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও নজরদারি বাড়াতে হবে। এই চক্রগুলো ভেঙে না ফেললে সমস্যার মূল কারণ দূর হবে না।

সবশেষে, আমাদের নিজেদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। সাফল্য মানেই বিদেশ নয়; সাফল্য মানে নিজের অবস্থানে থেকে সম্মানজনক, নিরাপদ ও অর্থবহ জীবনযাপন। দেশের মাটিতে বাবা-মায়ের স্নেহছায়ায়, নিজের পরিশ্রমে অর্জিত এক প্লেট ডালভাত - তা হয়তো ইউরোপের রঙিন স্বপ্নের চেয়েও বেশি তৃপ্তিদায়ক, বেশি বাস্তব।

লেখক :

রবিউস সানি জোহা

শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড জিওগ্রাফী বিভাগ 
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/164153