থ্যালাসেমিয়া এক নীরব মহাআতঙ্কের নাম

থ্যালাসেমিয়া এক নীরব মহাআতঙ্কের নাম

প্রতিটি বাবা-মায়ের স্বপ্ন থাকে এক সুস্থ-সবল সন্তানের। কিন্তু সেই স্বপ্ন যখন এক নিমিষেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়, তখন তার চেয়ে ভয়াবহ আর কিছু হতে পারে না। এমনই এক দুঃস্বপ্নের নাম থ্যালাসেমিয়া। এটি কোনো সংক্রামক রোগ নয়, বংশগত একটি রোগ। আপাতদৃষ্টিতে এর কোনো জাঁকজমকপূর্ণ প্রকাশ না থাকলেও, যে পরিবারে একজন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু জন্মায়, সেই পরিবার জানে এর নীরব যন্ত্রণা কতটা গভীর এবং এর আতঙ্ক কতটা ভয়াবহ। তাই এই রোগটিকে ‘নীরব মহাআতঙ্ক’ বললে এতটুকুও অত্যুক্তি করা হয় না। থ্যালাসেমিয়া আসলে কী? থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তস্বল্পতাজনিত রোগ। আমাদের রক্তের লোহিত কণিকায় থাকা হিমোগ্লোবিন নামক প্রোটিন সারা শরীরে অক্সিজেন পরিবহন করে। থ্যালাসেমিয়া হলে এই হিমোগ্লোবিনের উৎপাদন ত্রুটিপূর্ণ হয়, যার ফলে লোহিত রক্তকণিকাগুলো সময়ের আগেই ভেঙে যায় এবং শরীরে তীব্র রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। প্রধানত দুই ধরনের থ্যালাসেমিয়া দেখা যায় আলফা থ্যালাসেমিয়া এবং বিটা থ্যালাসেমিয়া। হিমোগ্লোবিন অণু দুটি আলফা ও দুটি বিটা গ্লোবিন চেইন দিয়ে তৈরি। আলফা চেইনের উৎপাদনে ত্রুটি হলে আলফা থ্যালাসেমিয়া এবং বিটা চেইনের উৎপাদনে সমস্যা হলে বিটা থ্যালাসেমিয়া হয়। আমাদের দেশে বিটা থ্যালাসেমিয়ার প্রকোপই সবচেয়ে বেশি। গুরুত্বের দিক থেকে থ্যালাসেমিয়া দুই প্রকারের: থ্যালাসেমিয়া মেজর: এটি রোগের তীব্র পর্যায়। যখন কোনো শিশু তার বাবা এবং মা উভয়ের থেকেই ত্রুটিপূর্ণ জিন লাভ করে, তখন সে থ্যালাসেমিয়া মেজর নিয়ে জন্মায়। এই শিশুদের জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই তীব্র রক্তস্বল্পতা দেখা দেয় এবং বেঁচে থাকার জন্য প্রতি মাসে এক বা একাধিকবার রক্ত পরিসঞ্চালনের প্রয়োজন হয়। থ্যালাসেমিয়া মাইনর বা বাহক: যখন কোনো ব্যক্তি শুধুমাত্র বাবা অথবা মায়ের কাছ থেকে একটি ত্রুটিপূর্ণ জিন পায়, তখন তাকে থ্যালাসেমিয়ার বাহক বা ট্রেইট বলা হয়। বাহকরা সাধারণত পুরোপুরি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন। তাদের মধ্যে মৃদু রক্তস্বল্পতা থাকতে পারে, যা অনেক সময় সাধারণ রক্তস্বল্পতা বলে ভুল হয়। বাহকদের কোনো বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না, কিন্তু তাদের বিপদ অন্য জায়গায়।

ভয়াবহ বাস্তবতা এবং নীরব যন্ত্রণা : থ্যালাসেমিয়া মেজরে আক্রান্ত একটি শিশুর জীবন কাটে দুঃসহ কষ্টের মধ্য দিয়ে। প্রতি মাসে হাসপাতালে যাওয়া, যন্ত্রণাদায়ক সূঁচের মাধ্যমে রক্ত গ্রহণ করা এবং এর ফলস্বরূপ শরীরে জমতে থাকা অতিরিক্ত আয়রন তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। এই অতিরিক্ত আয়রন শরীর থেকে বের করার জন্য প্রতিদিন ইনজেকশন বা দামি ঔষধ গ্রহণ করতে হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং কষ্টকর। সঠিক চিকিৎসা না হলে এই আয়রন হৃৎপিন্ড, যকৃত এবং অন্যান্য অঙ্গে জমে গিয়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল করে দেয় এবং রোগীর অকালমৃত্যু ঘটায়। একটি শিশুর এই শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি তার পরিবারকে বয়ে বেড়াতে হয় এক মানসিক ও অর্থনৈতিক বোঝা। বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া রোগীর চিকিৎসার গড় মাসিক খরচ ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা বা তারও বেশি, যা একটি মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য বহন করা প্রায় অসম্ভব। ফলে বহু পরিবার ধীরে ধীরে নিঃস্ব হয়ে যায় এবং অনেক শিশু অর্থাভাবে সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটিরও বেশি মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক এবং প্রতি বছর প্রায় ৭,০০০ শিশু থ্যালাসেমিয়া মেজর নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, এই নীরব আতঙ্ক আমাদের সমাজে কতটা গভীরে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিরোধই একমাত্র উপায় দুঃখজনক হলেও সত্য যে, থ্যালাসেমিয়ার কোনো স্থায়ী নিরাময় নেই (বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ)। কিন্তু সবচেয়ে আশার কথা হলো, এই রোগটি শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য। এর জন্য প্রয়োজন শুধুমাত্র সচেতনতা।

এই রোগ প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি হলো দুজন থ্যালাসেমিয়া বাহকের মধ্যে বিয়ে রোধ করা। কারণ, বাবা-মা দুজনেই যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, তবে তাদের সন্তান: ২৫% সম্ভাবনা নিয়ে থ্যালাসেমিয়া মেজর হতে পারে বা ৫০% সম্ভাবনা নিয়ে বাবা-মায়ের মতো বাহক হতে পারে। আবার ২৫% সম্ভাবনা নিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে পারে। কিন্তু একজন বাহকের সঙ্গে যদি একজন সুস্থ ব্যক্তির বিয়ে হয়, তবে তাদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়া মেজর হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই থাকে না। তাদের সন্তান বাহক হতে পারে, কিন্তু মারাত্মক রোগী হবে না।  আমাদের করণীয় : এই নীরব মহামারী থেকে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত আবশ্যক: বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা: বিয়ের জন্য পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের সময় জন্মপত্রিকা বা কুষ্ঠি মেলানোর চেয়েও জরুরি হলো রক্ত পরীক্ষা করা। একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষা, হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস এর মাধ্যমে সহজেই নির্ণয় করা যায় কেউ থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না।

ব্যাপক জনসচেতনতা: সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে গণমাধ্যম, স্কুল-কলেজ এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে দেশব্যাপী সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে যে, থ্যালাসেমিয়ার বাহক হওয়া কোনো অপরাধ বা লজ্জা নয়, এটি একটি জেনেটিক বৈশিষ্ট্য মাত্র। আসল ভুল হলো, না জেনে একজন বাহকের সঙ্গে আরেকজন বাহকের বিয়ে করা। সহজলভ্য স্ক্রিনিং ব্যবস্থা: দেশের সকল জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই রোগ নির্ণয়ের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে বা বিনামূল্যে রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। সামাজিক আন্দোলন: থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। পরিবারগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে তাদের সন্তানদের বিয়ের আগে এই পরীক্ষার জন্য উৎসাহিত করতে। একটু সচেতনতাই পারে একটি শিশুকে আজন্ম কষ্ট এবং একটি পরিবারকে অবর্ণনীয় যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে। আমরা যদি এখনই সতর্ক না হই, তবে এই নীরব ঘাতক আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক মহাআতঙ্ক হয়েই থেকে যাবে। আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব পালন করি এবং বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এক থ্যালাসেমিয়ামুক্ত সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তুলি।

লেখক :

হেনা শিকদার

শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, 

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/163978