দিনাজপুরের বীরগঞ্জে ভুল সিজারে মায়ের মৃত্যু ও অবহেলার অভিযোগে হামলা ভাঙচুর 

দিনাজপুরের বীরগঞ্জে ভুল সিজারে মায়ের মৃত্যু ও অবহেলার অভিযোগে হামলা ভাঙচুর 

বীরগঞ্জ (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার পৌর শহরের খানসামা রোডে অবস্থিত বীরগঞ্জ ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সিজার (অস্ত্রোপচার) চলাকালে এক প্রসূতির মৃত্যুকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় ক্লিনিক মালিক ও দায়িত্বরত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে গুরুতর গাফিলতি, অবহেলা এবং ঘটনার পর দায় এড়ানোর অভিযোগ উঠেছে।

একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হলেও মায়ের মৃত্যু হওয়ায় এলাকায় শোকের পাশাপাশি তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। নিহত সমেজা খাতুন(২৮) কাহারোল উপজেলার সরঞ্জা এলাকার বাসিন্দা ও আব্দুর রাজ্জাকের স্ত্রী। গত শুক্রবার বিকেলে তাকে বীরগঞ্জ ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভর্তি করা হয়। সন্ধ্যার আগেই তার সিজার অপারেশন সম্পন্ন হয় এবং একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়।

স্বজনদের অভিযোগ, অপারেশনের সময় রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডা. মো. বকুল হোসেন এবং অ্যানেসথেশিয়া প্রদানকারী শরিফুল ইসলাম যথাযথ ও সময়োপযোগী চিকিৎসা দিতে ব্যর্থ হন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণসহ গুরুতর জটিলতা দেখা দিলেও প্রয়োজনীয় জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি, যা শেষ পর্যন্ত মত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে দাবি পরিবারের।

অভিযোগ রয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে রোগীকে দ্রুত অন্যত্র পাঠিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হয়। পরে শারীরিক অবনতি হওয়ায় প্রসূতিকে জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনে নিয়ে যান। ঘটনার পর সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হিসেবে জানা যায়, ক্লিনিকের মালিক বেলাল হোসেনসহ চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফরা ক্লিনিক বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান।

একইসাথে ক্লিনিকে ভর্তি অন্যান্য রোগীদেরও নীরবে সরিয়ে নেওয়া হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, যা ঘটনাটিকে আরও সন্দেহজনক করে তুলেছে। ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্লিনিকের সামনে বিক্ষুব্ধ জনতা জড়ো হয়। রাত সাড়ে ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দফায় দফায় ভাঙচুর, হট্টগোল, সড়ক অবরোধ এবং আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানানো হয়। বীরগঞ্জ টু খানসামা সড়কে প্রায় এক ঘণ্টা অবরোধের ফলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

এছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপংকর বর্মনকে অবরুদ্ধ করার চেষ্টাও করা হয় বলে জানা যায়। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং প্রাথমিকভাবে ক্লিনিকটি সিলগালা করা হয়।

ঘটনাস্থলে বীরগঞ্জ থানার অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেনাবাহিনীর একটি টিমও দায়িত্ব পালন করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও বিক্ষুব্ধ জনতার মধ্যে কয়েক দফা ধাক্কাধাক্কির ঘটনাও ঘটে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বীরগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাওন কুমার সরকার ও বীরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল ইসলাম।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দীপংকর বর্মন জানান, পরিস্থিতি পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ক্লিনিকটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে আইনানুগ মামলা গ্রহণ এবং তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাওন কুমার সরকার বলেন, সিজার অপারেশনের সময় রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়ে এক পর্যায়ে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ স্বজন ও স্থানীয়রা ক্লিনিক ঘেরাও করে। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ক্লিনিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকায় সেটি সিলগালা করা হয়েছে। পরবর্তীতে অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে নিহতের পরিবারের দাবি, অভিযুক্ত ক্লিনিকটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা এবং মালিকসহ দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাদের অভিযোগ, এর আগেও এই ক্লিনিকে একাধিক প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/163717